পেপ গার্দিওলা হতাশ হয়ে পড়েছিলেন সে দিন।
তখনও আজকের পেপ হয়ে ওঠেননি তিনি। লিগ, কাপ, চ্যাম্পিয়নস লিগের রাশি রাশি সাফল্য পায়ের তলে লুটায়নি। ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কোচ আখ্যা দিয়ে যেকোনো চায়ের টেবিলে তাঁকে নিয়ে কথার তুবড়ি ছোটানোও শুরু করেনি কেউ। মাত্রই ইউরোপীয় অভিজ্ঞতা নেওয়া শেষে কাতারে পাড়ি জমিয়েছেন, ধীরে ধীরে খেলোয়াড়ি জীবন শেষ করার ক্ষণ গুণছেন।
হতাশ হওয়ার ঘটনাটা তখনকারই। বিশ্বখ্যাত সংবাদমাধ্যম টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিমর্ষ গার্দিওলার শব্দগুলো, ‘আমার মতো খেলোয়াড়দের দিন ফুরিয়ে আসছে। ফুটবল দিনকে দিন শরীরনির্ভর হয়ে যাচ্ছে, যেখানে আমাদের দাম সামান্যই।’
তা, খেলোয়াড় হিসেবে কেমন ছিলেন গার্দিওলা? বলা হয়, নব্বইয়ের দশকের অন্যতম সেরা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ছিলেন তিনি। ইয়োহান ক্রুইফ তাঁর দলের ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের কাছ থেকে যেমন গুণাবলি চান, গার্দিওলার সবটুকুই ছিল। কেমন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার চাইতেন ক্রুইফ?
ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার বলতে তখন একবাক্যে মনে করা হোত এমন কাউকে, শরীরনির্ভর খেলায় যার জুড়ি মেলা ভার। মাঠের মাঝখানে ‘শত্রু’র সঙ্গে যুদ্ধে যেতেও আপত্তি নেই যার। মাঠকে দৃষ্টিনন্দন শিল্পকর্মের কোনো ক্যানভাস নয়, বরং কোনো যুদ্ধের ময়দান হিসেবে মনে করেন যিনি। শক্তির প্রদর্শনীতে একের পর এক ট্যাকল, ফাউল, ইন্টারসেপশন করে অপেক্ষাকৃত সৃষ্টিশীল সতীর্থের পায়ে বলটা এগিয়ে দেবেন, ব্যস। কাজ অতটুকুই। ও কাজ দেখে চোখ জুড়ায় না। প্রশান্তি মেলে না। তবে কাজ হয় ঠিকই। ফুটবল-শিল্পী নামের প্রদীপের তলার অন্ধকার জায়গাটুকুর মতোই অপাংক্তেয় তাঁরা। জিদানের পাশে ম্যাকেলেলে বা দেশম যেমন। পিরলোর গাত্তুসো। স্কোলসের কিন। জিদান, পিরলোদের ফুটবলশৈলী দেখে মুগ্ধ হওয়া মানুষগুলো গাত্তুসো আর দেশমদের মনে রাখে কই?
ক্রুইফের অবশ্য শরীরনির্ভর ফুটবল খেলা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার পছন্দ ছিল না মোটেও। ডিফেন্স লাইনের একটু সামনে, ঠিক মধ্যিখানে – এমন একজন খেলোয়াড়কে চাইতেন তিনি – মারামারি করার চেয়ে যার রক্ষণভাগ থেকে বল তাড়াতাড়ি বের করে সামনে পাঠানোর দিকে মনোযোগ বেশি, যাতে প্রতিপক্ষ চেপে ধরে না বসতে পারে।
ফুটবল মাঠটা যার কাছে সবুজ এক নকশিকাঁথা, লং পাস আর শর্ট পাস নামের বিনি সুতোর হাজার ফোঁড়ে যা হৃদয় কেড়ে নেয়। ও কাজে কুস্তিগীরের মতো গাট্টাগোট্টা না হলেও চলে। প্রতিপক্ষের প্রেস ভেদ করে কুশলী ভঙ্গিমায় বলটা নিজেদের রক্ষণভাগ থেকে দ্রুততার সঙ্গে বের করে সামনে পাঠিয়ে দেওয়াই মুখ্য।
গার্দিওলা এমনটাই ছিলেন।
অবশ্য দুই ধরণের ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডাররা এক বিন্দুতে এসে মিলে যেতেন বারবার। পাদপ্রদীপের আড়ালে থাকা ওই অন্ধকার জায়গাটায় এসে ভিড় জমাতেন সব ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার – গোলের খেলা ফুটবলে যাদের গুরুত্ব বোঝার লোকের সংখ্যা যৎসামান্য। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো বলা যেতেই পারে – জিদান, পিরলোদের মতো ফুটবলশৈলী দিয়ে মাতোয়ারা করা শৈল্পিক ‘ঈশ্বর’রা থাকেন ওই ভদ্রপল্লীতে, যেখানে গার্দিওলা বা দেশমদের খুঁজে পাওয়া যায় না।
গার্দিওলার হতাশার জন্ম ওই উপলব্ধি থেকেই।
উপলব্ধিগুলো আরও বাঙময় হয়ে উঠত যেকোনো ব্যক্তিগত পুরস্কারের মঞ্চে। সেখানে আক্রমণাত্মক খেলোয়াড়দের জয়জয়কার হলেও, রক্ষণাত্মক খেলোয়াড়দের পিঠ চাপড়ে দেওয়ার মানুষ খুঁজে পাওয়া যেত না। ক’জন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারকে ব্যালঁ দ’র বা ফিফা বর্ষসেরা হতে দেখেছেন?
উত্তর খুঁজতে পেছাতে হবে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত। জার্মানির ম্যাথিয়াস স্যামার জিতেছিলেন যেবার। তার আগের উদাহরণ? সেই ১৯৬২ সালে – চেক প্রজাতন্ত্রের ইয়োসেফ মাসোপুস্ত। বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, যেকোনো ফুটবলীয় আলোচনায় এদের নাম শোনেন সেভাবে? গার্দিওলার আক্ষেপের সুরটা ধরতে পারছেন তো?
আক্ষেপকে সন্তুষ্টির রূপ দিতে সবার আগে এগিয়ে এসেছিলেন গার্দিওলাই – সের্হিও বুসকেতস নামের জনৈক এক ভদ্রলোককে বিশ্বসেরা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার বানানোর মাধ্যমে। ফুটবল দুনিয়াকে বাধ্য করেছেন, বুসকেতসের মতো ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারদের কুর্নিশ করতে, প্রাপ্য সম্মান দেওয়াতে। বুসকেতসের সাফল্য দেখে এই শিল্পে দক্ষ হওয়ার সাহস দেখিয়েছেন, দেখাচ্ছেন দানি পারেহো, গ্রানিত শাকা, জর্জিনিও, ফের্নান্দিনিও, মাইকেল ক্যারিক, এনসো ফের্নান্দেস, থিয়াগো আলকানতারা, মার্তিন জুবিমেন্দিরা।
সবচেয়ে বেশি সাহস দেখিয়েছেন গার্দিওলারই আরেক শিষ্য। রদ্রিগো এর্নান্দেস কাসকান্তে। একনামে – ‘রদ্রি’। যে সাহস, স্পর্ধা, ঔদ্ধত্যর ঔজ্জ্বল্য এতটাই যে – তাতেই ব্যালঁ দ’রের মঞ্চ আলোকিত হলো। ম্লান হলো ভিনিসিয়ুস জুনিয়রদের মতো প্রতিভাবান ফরোয়ার্ডদের ঝলক।
থিয়েরি অঁরি’র উক্তিটাই যথেষ্ট মাঠে রদ্রির গুরুত্ব বোঝাতে, ‘লোকে মিডফিল্ডারদের ভুলে যায়। তাঁরা দলের হৃদয়। রদ্রি যেমন। সে ম্যানচেস্টার সিটির হৃদয়।’
আধুনিক ফুটবলে খেলোয়াড়দের কার্যকারিতার মাপকাঠি যেখানে গোল আর গোল-সহায়তার পরিসংখ্যান, রদ্রির বিজয় নিঃসন্দেহে ওই গৎবাঁধা ধারণার বাঁধ ভেঙে দেওয়া এক মহাপ্লাবন। যে মহাপ্লাবনের প্রতিটা ঢেউয়ে মিশে আছে গার্দিওলা, বুসকেতসদের মতো হাজারো ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার বা ডিপ-লায়িং প্লেমেকারদের শত বছরের আক্ষেপ। প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সমীকরণে চিরন্তন অমিল খুঁজে পাওয়ার কষ্ট।
যে কষ্টগুলো আজ সুখপাখি হয়ে ডানা মেলেছে ম্যানচেস্টারের নীল আকাশে।