যে আর্জেন্টিনা এমিলিয়ানো মার্তিনেসেরও

মেসি-ম্যারাডোনার দেশে আক্রমণভাগে আলো ছড়ানো ফুটবল-শিল্পীর অভাব ছিল না কোনোকালে।

মেসি-ম্যারাডোনা হতে গিয়েও না হতে পারার কানাগলিতে কান পাতলে এখনও শোনা যায় ওর্তেগা, আইমার, দিবালা, গ্যাশার্দো বা লাতোরে-দের দীর্ঘশ্বাস। নিজের খামখেয়ালিপনায় ওপথ হারিয়েছেন রিকেলমেরাও। গায়ে পরবর্তী মেসি-ম্যারাডোনা হওয়ার ট্যাগ সেভাবে না লাগলেও আর্জেন্টিনার জার্সি রাঙিয়েছেন দি মারিয়া, আগুয়েরো বা হিগুয়াইনরা। আর্জেন্টিনার যেকোনো পাড়ায় চলতে থাকা ফুটবল ম্যাচে আক্রমণভাগে কে খেলবে জানতে চাইলে অন্তত ডজনখানেক ছেলে হাত তুলে ‘আমি, আমি’ বলে চিৎকার করবে।

যে হাত গোল আটকানোর কাজে ব্যবহার করতে তাদের বরাবরের অনীহা। বাইনোকুলার দিয়েও মানসম্পন্ন গোলকিপার খুঁজে পাওয়া যায় না। সবাই মেসি-ম্যারাডোনা হতে চায়, উবালদো ফিলোল বা নেরি পুম্পিদো হওয়ার সাধ ক’জনেরই বা!

যার প্রভাব পড়েছে দেশটার সামগ্রিক ফুটবলীয় চিত্রে। নব্বইয়ের দশক থেকে একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দশক পর্যন্ত দেশটায় কোনো আন্তর্জাতিক মানের গোলকিপার ছিল না বললেই চলে। আটানব্বইতে কার্লোস রোয়া আলো ছড়িয়ে স্যার আলেক্স ফার্গুসনের নজরে পড়লেন ঠিকই, কিন্তু পিটার স্মাইকেলের বদলি হয়ে ওল্ড ট্রাফোর্ডে যাওয়া হয়নি তাঁর। চিরায়ত আর্জেন্টাইন পাগলামির বলি হয়ে ফুটবল-টুটবল ছেড়ে পরিবার নিয়ে পালিয়ে গেলেন আর্জেন্টিনার এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে। কারণ? তাঁর মনে হয়েছিল সহস্রাব্দের শুরুতে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে, দুই দিনের দুনিয়ায় ফুটবলের মতো দুনিয়াবি জিনিসে ব্যস্ত না থেকে পরিবারের সঙ্গে ধর্মকর্মে মন দেওয়াই শ্রেয়!

রোয়া না পারলেও, সের্হিও রোমেরো পেরেছিলেন ওল্ড ট্রাফোর্ডের টিকিট কাটতে। তাঁর অবশ্য ‘মাথায়’ না, সমস্যা ছিল হাতে। বল সেভাবে গ্রিপ করতে পারতেন না। যখন-তখন সেভের নামে বল পাঞ্চ করে উলটো দলকে বিপজ্জনক অবস্থাতে ফেলেছেন বেশ ক’বার। ২০১৪ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তোলার পেছনে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাবেক এই গোলকিপারের হাত থাকলেও নয়্যার-বুফন-ক্যাসিয়াসদের পর্যায়ে তাঁর পৌছানো হয়নি কখনই। ওদিকে পাবলো ক্যাভাইয়েরো, রবের্তো আবোনদানজিয়েরি, ফ্রাঙ্কো আরমানি, লিওনার্দো ফ্রাঙ্কো বা উইলি ক্যাবায়েরোর নাম যত কম নেওয়া যায় – ততই ভালো।

গোলপোস্টের নিচের অন্ধকার সে সময়টায় টেমস নদীর তীরে গুমরে মরছিলেন আরেকজন, শুধু একটা সুযোগের অভাবে। বন্ধুরা ডাকে ‘দিবু’ বলে। ভালো নাম এমিলিয়ানো দামিয়ান মার্তিনেস। মূল গোলকিপার হিসেবে আর্সেন ওয়েঙ্গার যাঁর ওপর কখনই আস্থা রাখেননি। একই পথে চলেছেন উনাই এমেরি আর মিকেল আরতেতাও। কখনও ভয়চেখ স্টাজনি, কখনও লুকাশ ফাবিয়ানস্কি, কখনও পিওতর চেক, কখনও দাভিদ ওসপিনা বা বার্নড লিনো – মূল একাদশ তো দূর, বেঞ্চেও জায়গা হোত না এই আর্জেন্টাইনের। ফি-মৌসুম ধার চুক্তিতে নতুন নতুন ক্লাবে পাড়ি জমাতেন।

বীতশ্রদ্ধ হলেও, আশা হারাননি। জানতেন, সুসময় আসবেই। ফেসবুকে পোস্ট করা ছবির ক্যাপশনেও সে আশার বাণী দেখা গেল, ‘আমার সময় আসবে।’

আর গত রাতে ইতিহাসের প্রথম গোলকিপার হিসেবে টানা দ্বিতীয়বারের মতো জিতলেন ইয়াশিন ট্রফি – গোলদাতাদের জমানায় পাদপ্রদীপের আড়ালে থাকা গোলপ্রহরীদের সবচেয়ে বড় পুরস্কার

পরের গল্পটা সবারই জানা।

লিনোর চোটে সুযোগ পেয়ে আর্সেনালকে এফএ কাপ-শিল্ড জেতানো, নিজের জাত চেনানো। এখন ফি সপ্তাহে আর্সেনালকে আফসোসের উপলক্ষ এনে দেন হয় আর্জেন্টিনা, নয় অ্যাস্টন ভিলার হয়ে পারফর্ম করে। অধরা আন্তর্জাতিক শিরোপার স্বাদও মেসি পেয়েছেন, পাশে মার্তিনেস ছিলেন বলেই। পোস্টের নিচে পাহাড়সমান আত্মবিশ্বাস, মুখে কথার তুবড়ি কিংবা ক্ষণিক দম্ভের আস্ফালন প্রতিপক্ষের বিরক্তির কারণ হলেও, আর্জেন্টাইনরা মেনে নিয়েছে সানন্দে। ওই যে, যে গরু দুধ দেয়, তার লাথি খাওয়া ভালো!

যে পিওতর চেকের জন্য লন্ডনে ঠাঁই হয়নি, ক’দিন আগে প্রিমিয়ার লিগ ক্যারিয়ারে নিজের পঞ্চম পেনাল্টি আটকে সেই চেককে রেকর্ড বইয়ের এক পাতা থেকে মুছে দিয়েছেন ইংলিশ লিগে সবচেয়ে বেশি পেনাল্টি সেভ করা গোলকিপার হিসেবে।

আর গত রাতে ইতিহাসের প্রথম গোলকিপার হিসেবে টানা দ্বিতীয়বারের মতো জিতলেন ইয়াশিন ট্রফি – গোলদাতাদের জমানায় পাদপ্রদীপের আড়ালে থাকা গোলপ্রহরীদের সবচেয়ে বড় পুরস্কার।

আর প্রমাণ করলেন, ফুটবল-মানচিত্রে আর্জেন্টিনা যতটা মেসি-মারাদোনার, ঠিক ততটা মার্তিনেসেরও!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Post

Got a PROJECT

IN MIND?

©2024 Nishat Ahmed Zishan, All Rights Reserved.

Developed by Asif Mollik