সি সেনিয়োর!

‘ছুটিতে বাড়ি যাব না। এখানেই থাকব। আমাকে আরও অনুশীলন করতে হবে। খামোকা সময় নষ্ট করতে চাই না। জীবনে ভালো কিছু করতে পারলে তখনই থামব শুধু, তার আগে না…’
জীবনে অনেক খেলোয়াড়কেই কোচিং করিয়েছেন হেমারসন মারিয়া। একেকজনের একেক স্বভাব, খেলার ধরণ একেক। কেউ চুপচাপ, কেউ আবার দিন কাটায় ঝগড়াঝাটি করে। হাসিখুশি মেজাজের, ঠাট্টা-মশকরা করে দিন কাটানোর ছেলেও নেহায়েত কম নেই। তবে মোটামুটি সবাই দুই জায়গায় এসে মিলে যায়।
সফল ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন, আর পরিবারের প্রতি টান।
তবে কারওর মাঝে এমন দৃঢ়তা দেখেছেন বলে মনে করতে পারলেন না মারিয়া। এত কম বয়সে জীবনের লক্ষ্য নিয়ে কী কাউকে এতটা অবিচল থাকতে দেখেছেন? কারওর মধ্যে দেখেছেন জীবনে ভালো করতে চাওয়ার জন্য এমন স্পৃহা? সেটাও মাথায় আসল না। অনূর্ধ্ব-১৭ প্রাদেশিক লিগের এক ম্যাচের পর সপ্তাহখানেকের ছুটি পেয়েছে ছেলেরা। ম্যাচ শেষে যে যার ঘরে ফিরেছে, পরিবারের টানে।
ব্যতিক্রম শুধু এই ছেলেটা। কিশোর বয়সেই যাকে পেটের দায়ে তিন হাজার কিলোমিটারেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে মাসেইও থেকে আসতে হয়েছে ফ্লোরিয়ানোপোলিসে, ফিগেইরেন্সের বয়সভিত্তিক দলের হয়ে খেলার জন্য।
তাই বলে পরিবারের জন্য কি তার প্রাণ পোড়ে না? অবশ্যই পোড়ে। পোড়ে বলেই ফিগেইরেন্স থেকে জার্মানির হফেনহেইমে নাম লেখানোর আগে নিশ্চিত হয়ে নেয়, মা-বাবা যেন মাসেইওর অপরাধপ্রবণ আর দারিদ্র্যপীড়িত এলাকা থেকে মুক্তি পায় – মোটামুটি ভদ্রস্থ এক অঞ্চলে নিজেদের বাড়ি বানিয়ে থাকতে পারে। বাবাকে যেন পথেঘাটে ঠাণ্ডা পানীয় বিক্রি করে না বেড়াতে হয়।
পকেটে টাকা নেই, পেটে খাবার নেই, কোচের আস্থা নেই, দিনশেষে নেই মা-বাবার স্নেহাশীষ – এত নেই-এর মাঝেও ছেলেটার মুখের হাসি মুছে যায়নি একটু। দৃঢ়চেতা মনে আঘাত এলেও সয়েছে ওই হাসিটুকু পুঁজি করে।
আজীবন।
একবার মাসেইওতে সপ্তাহভর বিদ্যুতের দেখা মিলল না। ছেলেটা তখন প্রাথমিক স্কুলে পড়ে, স্কুলশিক্ষিকার প্রশ্নের জবাবে জানায়, ফ্রিজে খাবার নেই একদম। উত্তর শুনে থতমত শিক্ষিকা বুঝতেই পারলেন না, এত কঠিন বাস্তবতার বয়ান ছেলেটা এমন হাসিমুখে, দাঁত বের করে কীভাবে দিয়ে যাচ্ছে!
ফিগেইরেন্সের বয়সভিত্তিক দলের ট্রায়ালে ওভারহেড কিকে জোড়া গোল করে হেমারসন মারিয়াদের মতো কোচদের মুগ্ধ করা ছেলেটা মূল দলে এসে তেমন পাত্তা পায়নি। আর দশজন ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকারের মতো খামোকা পায়ের কারুকাজ দেখাতে চাইত না, হয়তো সেটাই ছিল কোচ মার্সিও গোইয়ানোর বিরক্তির কারণ। দলের মধ্যে ওই ছেলেটাই সবচেয়ে বেশি বকা খেত।
বকাগুলো হাসিমুখে হজম করত সে।
ভাগ্যিস, আর্নস্ত ট্যানারের ফুটবলীয় দর্শন গোইয়ানোর মতো ছিল না। ভদ্রলোক তখন মাত্রই জার্মান ক্লাব হফেনহেইমের ক্রীড়া পরিচালক হয়েছেন। লোকমুখে ছেলেটার ভালো খেলার ফিরিস্তি শুনে সাত সমুদ্দুর তেরো নদী পাড়ি দিয়ে ততদিনে পা রেখেছেন এসেছেন ফ্লোরিয়ানোপোলিসে। সেদিন অবশ্য সাধারণ মানুষদের ফিগেইরেন্সের অনুশীলন দেখার অনুমতি দেওয়া হয়নি, অগত্যা মাঠের দারোয়ানকে ঘুষ দিয়ে ছেলেটার খেলা দেখতে ভিতরে ঢুকে গিয়েছিলেন। দেখলেন কোচের হাজারো বকাঝকা সহ্য করে পাক্কা টিমম্যানের মতো জান লাগিয়ে খেলে যাচ্ছে ছেলেটা। মেজাজ হারাচ্ছে না। স্ট্রাইকার হওয়া সত্ত্বেও নিচে না নেমে রক্ষণে সাহায্য না করার বাড়তি অহম নেই।
জীবনে হয়তো অনেক টাকাই অপচয় করেছেন। তবে সেই ঘুষের টাকাকে যে অন্তত অপচয়ের তালিকায় রাখবেন না ট্যানার, এটা নিশ্চিত!
লিভারপুলের কোচ ব্রেন্ডান রজার্স তাঁকে চাননি, চেয়েছিলেন অ্যাস্টন ভিলার বেলজিয়ান স্ট্রাইকার ক্রিস্টিয়ান বেনটেকে-কে। পরে লিভারপুলের ক্রীড়া পরিচালক মাইকেল এডওয়ার্ডসের জোরাজুরিতে অল রেডদের জার্সি পরার সুযোগ মেলে। ব্রাজিলের কোচ তিতে সুযোগ পেলেই তাঁকে দলে না ডেকে দিয়েগো সোউজা, দিয়েগো তারদেইয়িদের মতো বুড়োদের শরণ নিয়েছেন। ইউরোপে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে ব্রাজিলের মিডিয়া ডাকনাম দিয়েছে ‘নতুন আফোনসো আলভেস’ (মিডলসব্রোর সাবেক স্ট্রাইকার, যিনি ইউরোপে বাজেভাবে ব্যর্থ হয়েছিলেন)।
সব অবজ্ঞা সয়েছেন হাসিমুখে। উচ্চবাচ্য না করে নিজের কাজ করেছেন। ওই যে, জানতেন – জীবনে ভালো কিছু করতে পারলে সব অবজ্ঞাকারীরা এমনিতেই চুপ হয়ে যাবে। জানতেন, জীবনে চলার পথে গোইয়ানো, তিতে কিংবা রজার্সরা যেমন আছেন – আছেন ট্যানার, ইয়ুর্গেন ক্লপ কিংবা মাইকেল এডওয়ার্ডসের মতো কিছু মানুষও। শুধু দৃঢ়ভাবে নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকতে হবে, ব্যস।
ফিগেইরেন্স থেকে হফেনহেইম, কিংবা হফেনহেইম থেকে অ্যানফিল্ডের পথে ছেলেটাকে আলো দেখিয়েছে ওই দৃঢ়তা। সঙ্গে কঠোর পরিশ্রম আর প্রতিভার যুগলবন্দী তো ছিলই।
আর হ্যাঁ, হাসিমুখটাও।
লিভারপুলের হয়ে ৩৬০ ম্যাচে ১০৯ গোল আর ৭৯ গোলে সহযোগিতার পাশাপাশি যে হাসিমুখটা বিলিয়েছে আনন্দ। জুগিয়েছে অনুপ্রেরণা, সমর্থকদের দিয়েছে আশা, অসম্ভবকে সম্ভব করার দুঃসাহস।
লিভারপুলের কিংবদন্তি কোচ বিল শ্যাংকলি বলেছিলেন, ‘আমি লিভারপুলের মানুষের জীবনে আনন্দ বয়ে আনতে চাই’। কখনও শ্যাংকলির অধীনে না খেললেও, কথাটা বাস্তবায়ন করার দায়িত্বটা কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। যেখানেই গিয়েছেন, আনন্দ বিলিয়েছেন।
নিজের প্রিয় খেলোয়াড় ইয়ান কালাহানের ব্যাপারে শ্যাংকলিই আরেকটা কথা বলেছিলেন, ‘ফুটবলে যা কিছু ভালো, সবকিছুই ওর মধ্যে আছে।’
বলার অপেক্ষা রাখে না, এ যুগের রবের্তো ফিরমিনো বারবোসা দে অলিভিয়েরাকে দেখলে একই কথা বলতেন শ্যাংকলি। যে ফিরমিনো তাঁর প্রিয় লিভারপুলে আনন্দ বয়ে এনেছে। যার জন্য হাজারো কপাইট খুশিতে উদ্বেল হয়ে কোরাস ধরে অ্যানফিল্ডে –
দেয়ার’স সাম্থিং দ্যাট দ্য কপ ওয়ান্ট ইউ টু নো
দ্য বেস্ট ইন দ্য ওয়ার্ল্ড হিজ নেইম ইজ ববি ফিরমিনো
আওয়ার নাম্বার নাইন
গিভ হিম দ্য বল অ্যান্ড হি’ল স্কোর এভরি টাইম
সি সিনিয়োর
গিভ দ্য বল টু ববি অ্যান্ড হি উইল স্কোর!
জীবনে ভালো কিছু করতে চেয়েছিলেন। যে ক্লাবে খেলে বিশ্বসেরাদের কাতারে এসেছেন, আজ অ্যানফিল্ডে সে ক্লাবের সমর্থকদের কণ্ঠে আরও একটিবার এ গানটা শুনে ফিরমিনোর মনে হতে বাধ্য,
‘জীবনে ভালো কিছুই করেছি!’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Post

Got a PROJECT

IN MIND?

©2024 Nishat Ahmed Zishan, All Rights Reserved.

Developed by Asif Mollik