বিশ্বকাপ ফুটবলে বিচিত্র যত কাহিনি

কত ঘটনা, কত দুর্ঘটনায় পরিপূর্ণ বিশ্বকাপের ইতিহাস। বিশ্বকাপ সামনে রেখে সেসব বিচিত্র ঘটনা নিয়ে মালা গাঁথলে কিন্তু মন্দ হয় না। আজ প্রথম পর্বে আলোচিত হলো ১৯৩০ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপগুলোর বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ,

বাছাইপর্ববিহীন বিশ্বকাপ, ইউরোপের অনীহা
উরুগুয়েতে ১৯৩০ সালে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ কোনো বাছাইপর্ব ছিল না। ফিফা প্রায় সব দেশকেই সেখানে খেলার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। কিন্তু অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে লাতিন দেশ উরুগুয়েতে যাওয়ার ঝক্কি এড়াতে সেই বিশ্বকাপ নিয়ে কোনো আগ্রহই দেখায়নি গোটা ইউরোপ। পারে ফিফা সভাপতি জুলেরিমের হস্তক্ষেপে এন্ট্রি দেওয়ার শেষ দিনে বিশ্বকাপে নাম লেখায় ফ্রান্স, বেলজিয়াম, যুগোশ্লাভিয়া ও রোমানিয়া।

বিশ্বকাপ না খেলেই দেশে, কারণ পরীক্ষা
প্রথম বিশ্বকাপকে পিকনিক মুডেই নিয়েছিল অংশগ্রহণকারী দেশগুলো। এটির গুরুত্ব তাদের কাছে কতটা কম ছিল, সেটা বোঝা যায় একটি ঘটনাতেই। আর্জেন্টিনা দলের অধিনায়ক ম্যানুয়েল ফেইরা ছিলেন আইনের ছাত্র। গ্রুপপর্বের দুটি ম্যাচ খেলেই তিনি দেশে ফিরে যান পরীক্ষার কারণে।

বল নিয়ে ঝগড়া
প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ে। সে সময় বিশ্বকাপে ‘অফিশিয়াল বল’ বলে কিছু ছিল না। ফাইনালে দুই দলই দুটি বল মাঠে নিয়ে এসে আশা করে বসেছিল, রেফারি তাদের বলটি দিয়েই ফাইনাল খেলাবেন। এ নিয়ে ম্যাচ শুরুর আগে রীতিমতো ঝগড়াই বেধে যায়। পরে রেফারি দুই দলের মন রাখেন দুই অর্ধে দুই দলের দুই বল ব্যবহার করে।

ইতালির শাসক যখন রেফারি নির্বাচক
দ্বিতীয় বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় ১৯৩৪ সালে—ইতালিতে। দেশটিতে তখন স্বৈরশাসক বেনিতো মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী শাসন। মুসোলিনির কারণেই দ্বিতীয় বিশ্বকাপে নানা বিতর্ক ডালপালা মেলে। কথিত আছে, ইতালির শাসক নাকি বিশ্বকাপে ইতালির ম্যাচগুলোর রেফারি নিজে নির্বাচিত করতেন। অনেকেই বলেন, তাঁর প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের কারণেই ইতালি সে বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয়।

বিশ্বকাপে নাৎসিবাদের থাবা
ফ্রান্সে ১৯৩৮ সালের তৃতীয় বিশ্বকাপটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যে। সেবার প্রবর্তিত বাছাইপর্ব পেরিয়ে মূলপর্বে সুযোগ করে নিলেও অস্ট্রিয়া বিশ্বকাপ খেলতে পারেনি এডলফ হিটলারের দখলদারির কারণে। বিশ্বকাপের আগেই অস্ট্রিয়া দখল করে নেয় নাৎসি জার্মানি। কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে ম্যাচে কালো শার্ট পরে আর ম্যাচ শুরুর আগে ফ্যাসিস্ট স্যালুট দিয়ে প্রবল সমালোচনার মুখে পড়ে ইতালি দল। কালো শার্ট তখন ছিল ইতালির ফ্যাসিস্ট প্যারামিলিটারি বাহিনীর প্রতীক। যথারীতি সেবারও ট্রফি ঘরে তোলে মুসোলিনির ইতালি।

বিশ্বকাপ খেলতে ভারতের অস্বীকৃতি
১৯৩৮ সালের পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে বিশ্বকাপ মাঠে গড়াতে পারেনি ১৯৪২ ও ১৯৪৬ সালে। ১৯৫০ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত হয় চতুর্থ বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপে অংশ নেয় ১৬টি দল। সেবারই প্রথম বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ মেলে ভারতের। কিন্তু সে সময় অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন (এআইএফএ) সে সুযোগ গ্রহণ করেনি। অনেকেই বলেন, ভারত নাকি সে বিশ্বকাপে খালি পায়ে খেলতে চেয়েছিল। ফিফা সেটি দেয়নি বলেই ভারত দল পাঠায়নি। কিন্তু আসল ব্যাপারটা হচ্ছে, এআইএফএ বিশ্বকাপের চেয়ে অলিম্পিককেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল। তা ছাড়া ভারত থেকে ব্রাজিল যাওয়ার খরচও একটা বড় কারণ ছিল।

মারাকানা ট্র্যাজেডি
১৯৫০ বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল ব্রাজিল ও উরুগুয়ে। ম্যাচটি ড্র করলেই শিরোপা নিশ্চিত হতো ব্রাজিলের। বিশ্বকাপ জয়ের ব্যাপারে ব্রাজিল এতটাই আশাবাদী ছিল যে ফাইনালের দিন ব্রাজিলীয় দৈনিক ‘ও মুন্দো’ ব্রাজিল দলের একটা ছবি ছাপিয়ে হেডলাইন দিয়েছিল, ‘এরাই হলো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন!’ এই পত্রিকার অনেকগুলো সংখ্যা কিনে উরুগুয়ে অধিনায়ক ওবদুলিও ভ্যারেলা নিজেদের হোটেল রুমের টয়লেটে নিয়ে ফেলেছিলেন। সতীর্থদের বলেছিলেন পত্রিকাগুলোর কপিতে প্রস্রাব করতে! দলের আত্মবিশ্বাস তুলে ধরতেই ভ্যারেলা এমনটি বলেছিলেন। ফাইনালে লাখো স্বাগতিক দর্শকের সামনে এই উরুগুয়ে ২-১ গোলে ব্রাজিলকে হারিয়ে উৎসব করেছিল। ব্রাজিলিয়ানরা এ ঘটনায় এতটাই মুষড়ে পড়েছিল যে ফাইনালের পর মারাকানা স্টেডিয়ামের ছাদ থেকে লাফ দিয়ে দর্শকদের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। পর্তুগিজ ভাষায় এই ট্র্যাজেডি ‘মারাকানাজো’ নামে কুখ্যাত।

হায় হাঙ্গেরি!
১৯৫৪ সালে চতুর্থ বিশ্বকাপের আসর বসে সুইজারল্যান্ডে। সেবারই প্রথম বিশ্বকাপের ম্যাচ টেলিভিশনে প্রচারিত হয়। এই বিশ্বকাপের হট ফেবারিট ছিল ফেরেঙ্ক পুসকাসের হাঙ্গেরি। সঙ্গে স্যান্দর ককসিস, ন্যান্দর হিদেকুটি ও জোলতান সিবোরদের নিয়ে গড়া এই দল বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে অপরাজিত ছিল টানা ২৯ ম্যাচ। প্রায় ‘অজেয়’ এই দলটিকে ১৯৫৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে মাটিতে টেনে নামায় জার্মানি। ম্যাচে ২-০-তে এগিয়ে গিয়েও ৪-৩ গোলে হেরেছিল হাঙ্গেরি।

ব্রাজিল ও পেলের আবির্ভাব
১৯৫৮ সালে সুইডেনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল বিশ্বকাপ। এই বিশ্বকাপ বিখ্যাত হয়ে আছে পেলে নামের এক ফুটবল জাদুকরের আবির্ভাবের জন্য। এই বিশ্বকাপ বিখ্যাত বিশ্বসেরা দল হিসেবে ব্রাজিলের আবির্ভাবের জন্যও। গারিঞ্চা, ভাভা, দিদি, জাগালো ও পেলের নৈপুণ্যে সর্বপ্রথম শিরোপা ঘরে তোলে তারা।

সুইডেন বিশ্বকাপ ছিল সিআইএর সাজানো!
সুইডেনের কিছু সাংবাদিক ১৯৫৮ বিশ্বকাপ নিয়ে অদ্ভুত এক তত্ত্ব আবিষ্কার করেছিলেন। তাঁদের মতে, পুরো বিশ্বকাপটাই ছিল সাজানো—যুক্তরাষ্ট্রে বসেই নাকি এই বিশ্বকাপের ফল ঠিক করেছেন মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা—সিআইএ। বৈশ্বিক চক্রান্তের অংশ হিসেবেই নাকি সিআইএ দেখতে চেয়েছিল টেলিভিশনে প্রচারিত অনুষ্ঠানের ক্ষমতা কতটুকু, অনুষ্ঠানগুলো সাধারণ মানুষকে কতটা প্রভাবিত করতে পারে! যদিও পরে এই তত্ত্ব ভুল ও হাস্যকর হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

ব্যাটেল অব সান্তিয়াগো
চিলিতে ১৯৬২ সালের বিশ্বকাপ অনেকেরই পছন্দ হয়নি। বিশেষ করে ইউরোপীয় দেশগুলোর। ইউরোপীয়দের সঙ্গে এ ব্যাপারে মত মিলেছিল আর্জেন্টিনারও। প্রথমে অবশ্য বাষট্টির বিশ্বকাপ নিয়ে লাতিন দেশগুলো প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে রেখেছিল ফিফাকে—ইউরোপে আয়োজিত হলে তারা একযোগে বয়কট করবে বিশ্বকাপ। ফিফা লাতিন দেশগুলোর দাবি মেনে নেয়, কিন্তু বিশ্বকাপটি আয়োজিত হয় তুলনামূলক নতুন শক্তি চিলিতে। ইউরোপীয় দেশগুলো তো বটেই, ফিফার এই সিদ্ধান্ত পছন্দ হয়নি লাতিন অঞ্চলের ফুটবল শক্তিগুলোরও। নিজেদের গ্রুপপর্বের দ্বিতীয় ম্যাচে চিলি-ইতালি ম্যাচেই রেষারেষিটা প্রকট হয়ে ওঠে। সে ম্যাচের আগেই ইতালির কিছু সাংবাদিক চিলিকে হেয় করে নিজেদের পত্রিকায় কিছু লেখা লিখেছিলেন। লেখাগুলোতে ছিল চিলির প্রতি বিদ্বেষ। চিলিয়ান ফুটবলাররা তাই ভেতরে-ভেতরে ক্ষুব্ধই ছিলেন। ম্যাচটি ছিল মারামারিতে ভরা। দর্শকেরা সেদিন ফুটবলের বদলে দেখেছিলেন কুস্তি। অনেক সময় পুলিশকে মাঠে ঢুকে থামাতে হয়েছে খেলোয়াড়দের মারামারি। ইতিহাসে সেই ম্যাচকে ‘ব্যাটেল অব সান্তিয়াগো’ বলা হয়। উল্লেখ করা যেতে পারে, সে ম্যাচের পরপরই ফিফা ফুটবল ম্যাচে লাল ও হলুদ কার্ডের প্রচলন করে।

বিশ্বকাপের ‘বীর’ যখন এক কুকুর
১৯৬৬ সালে ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ জয় করে ইংল্যান্ড। তবে এই বিশ্বকাপের আসল ‘বীর’ পিকলস নামের একটি কুকুর। কারণ, এই কুকুরটিই সম্মান বাঁচিয়েছিল আয়োজকদের। বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগে আগেই এক প্রদর্শনী থেকে জুলেরিমে ট্রফিটি চুরি হয়ে গিয়েছিল। অনেক খোঁজাখুঁজির পর জুলেরিমে ট্রফির আশা যখন সবাই ছেড়ে দিয়েছে, ঠিক তখনই লন্ডনে রাস্তার পাশের একটি ঝোপ থেকে পিকলস উদ্ধার করে খবরের কাগজ দিয়ে মোড়ানো ট্রফিটি।

ব্রাজিলের তৃতীয় শিরোপা, খল নায়ক ববি মুর
তর্কযোগ্যভাবে ইতিহাসের সেরা দল নিয়ে ব্রাজিল বিশ্বকাপ জেতে সেবার। আগেরবারের চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড সেবার বিশ্বকাপ শুরুর আগেই বেশ কিছু ঝামেলায় পড়ে—কলম্বিয়ার এক গয়নার দোকান থেকে ব্রেসলেট চুরি করার অপরাধে গ্রেপ্তার হন ইংলিশ অধিনায়ক ববি মুর। দেশ থেকে নিজেদের খাবার মেক্সিকোতে বয়ে নিয়ে যাওয়ার পরেও পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের আগে বিয়ার পান করতে গিয়ে খাদ্যে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হন গোলরক্ষক গর্ডন ব্যাংকস। পরে সবকিছু ছাপিয়ে দুর্বার পেলে, কার্লোস আলবার্তো, জেয়ারজিনহো, গেরসন, ক্লদোয়ালদো, রিভেলিনোর ব্রাজিল তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে চিরদিনের জন্য নিজেদের করে নেয় জুলেরিমে ট্রফি।

*৩১ মে, ২০১৮ তারিখে দৈনিক প্রথম আলো-তে প্রকাশিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Post

Got a PROJECT

IN MIND?

©2024 Nishat Ahmed Zishan, All Rights Reserved.

Developed by Asif Mollik