বিশ্বকাপটাকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য কত দল কত কিছুই না করে! কেউ ট্রফি জেতার জন্য, কেউ পরের রাউন্ডে যাওয়ার জন্য, আবার কেউ কেউ শুধুমাত্র একটা ম্যাচ জেতার জন্য সম্ভাব্য যা যা করা সম্ভব, সবকিছুই করে। তাই বিশ্বকাপের মত বড় আসরে ম্যাচ পাতানোর শঙ্কা সবসময়ে থেকেই যায়। যদিও কোন ম্যাচ পাতানোর শঙ্কাই অবিসংবাদিত সত্য হিসেবে প্রমাণিত হয়নি, কিন্তু তাতে সন্দেহবাদীরা থেমে থাকবেন কেন? আজকের আয়োজন সেসব ম্যাচ নিয়ে, যাদেরকে সন্দেহবাদীরা আখ্যা দিয়েছেন পাতানো ম্যাচ হিসেবে! (২০১৮ বিশ্বকাপের আগে দৈনিক প্রথম আলো তে প্রকাশিত)
- ইতালির উত্থান : ১৯৩৪ বিশ্বকাপ
নিন্দুকদের কথা মানলে কোন নির্দিষ্ট ম্যাচ নয়, বরং গোটা ১৯৩৪ বিশ্বকাপটাই ছিল পাতানো! ১৯৩৪ বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ ছিল ইতালি, বিশ্বকাপ জেতেও তারা। কিন্তু ইতালির প্রথম বিশ্বকাপ-গৌরব অনেকটাই প্রশ্নবিদ্ধ তাদের রাষ্ট্রপ্রধান বেনিতো মুসোলিনির নানা হস্তক্ষেপে। ইতালির এই স্বৈরশাসক ইতালির প্রতিটি ম্যাচের রেফারি নিজে নির্বাচন করতেন বলে শোনা যায়। ব্যাপারটা সবার চোখে দৃষ্টিকটু হলেও সেই স্বৈরাচারী শাসকের ভয়ে অনেকেই মুখ খুলে নিজের বিপদ ডেকে আনতে চায়নি। কিন্তু তাতে সন্দেহবাদীদের মুখ থামেনি, ম্যাচ পাতানোর নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হিসেবে এখনো তারা এই টুর্নামেন্টের উদাহরণ দেন।
- আর্জেন্টিনা-পেরু : ১৯৭৮ বিশ্বকাপ
১৯৭৬ সালে সামরিক অভ্যুত্থান হয় আর্জেন্টিনায়। দেশটির সামরিক জান্তা মাত্র দুই বছরের মধ্যেই বহির্বিশ্বের কাছে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার উপলক্ষ হিসেবে বেছে নিল বিশ্বকাপকে। এ উপলক্ষে হাজার হাজার দরিদ্র মানুষকে শহর থেকে বিতাড়িত করে নিয়ে যাওয়া হল গ্রামাঞ্চলে, যেখানে বিশ্বকাপের ডামাডোল নেই। স্বৈরশাসক হোর্হে ভিদেলা আরও একটি স্বপ্ন দেখা শুরু করেন। তাঁর শাসনামলেই যেন আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিততে পারে—এমন লক্ষ্য স্থির করলেন তিনি। সে লক্ষ্য বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ চেষ্টাই করেন তিনি। কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে হলে দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচে পেরুকে কমপক্ষে ৪ গোলের ব্যবধানে হারাতে হতো আর্জেন্টিনাকে। আর্জেন্টিনা ম্যাচটি জেতে ৬-০ গোলে। ব্যাপারটা বিতর্ক ছড়ায় ব্যাপক। কারণ বিশ্বকাপের প্রথম ৫ ম্যাচে পেরে মাত্র ৬ গোল হজম করেছিল। কানাঘুষা উঠল ভিলা নাকি বিপুল অর্থের বিনিময়ে পেরুকে কিনে ফেলেছেন। বিশ্বকাপের পরপরই দারিদ্র্যপীড়িত পেরুতে ৩৫ হাজার মেট্রিক টন গম পাঠানো হলে ব্যাপারটা নিয়ে সন্দেহবাদীরা আরো নিঃসন্দেহ হয়ে ওঠেন যেন। পাশাপাশি আর্জেন্টিনার কেন্দ্রীয় ব্যাংক জব্দ হয়ে থাকা পেরুর ৫০ মিলিয়ন ডলার ফেরত দিয়ে দেওয়ার পর নিন্দুকেরা ব্যাপারটি বিশ্বাসই করা শুরু করে দেন।
- পশ্চিম জার্মানি-অস্ট্রিয়া : ১৯৮২ বিশ্বকাপ
পরের রাউন্ডে যাওয়ার জন্য ১৯৮২ বিশ্বকাপে পশ্চিম জার্মানি আর অস্ট্রিয়া যা করে, তার তুলনা বোধহয় নেই। সেবার পশ্চিম জার্মানি, আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া আর চিলি ছিল একই গ্রুপে। তখন ম্যাচ জিতলে এখনকার মত ৩ পয়েন্ট দেওয়া হত না। ম্যাচ জিতলে ৩, ড্র করলে ১ আর হারলে কোন পয়েন্ট নেই, এরকমই ছিল নিয়ম। প্রথমে আলজেরিয়ার কাছে ২-১ গোলে হেরে টুর্নামেন্ট শুরু করা পশ্চিম জার্মানি নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে চিলিকে বিধ্বস্ত করে ৪-১ গোলে। সে সময় আলজেরিয়ার কাছে পশ্চিম জার্মানির হারকে বলা হচ্ছিল বিশ্বকাপ ইতিহাসেরই অন্যতম বড় অঘটন! এই ম্যাচের আগে আফ্রিকার ইতিহাসের কোন দল বিশ্বকাপ এর আসরে কোন ইউরোপিয় দলকে হারাতে পারেনি। ওদিকে চিলিকে ১-০ গোলে হারিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করা অস্ট্রিয়া দ্বিতীয় ম্যাচে আলজেরিয়াকে ২-০ গোলে হারায়। আর আলজেরিয়া পশ্চিম জার্মানিকে ২-১ গোলে হারিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করলেও পরে অস্ট্রিয়ার কাছে ২-০ গোলে হেরে যায়, আর গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে চিলিকে ৩-২ গোলে হারিয়ে চার পয়েন্ট অর্জন করে রাখে।
শেষ রাউণ্ডের ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল আলজেরিয়া-চিলি ও পশ্চিম জার্মানি-অস্ট্রিয়া। তবে এখন যেরকম গ্রুপপর্বের শেষ রাউণ্ডের ম্যাচগুলো সব একসাথে হয়, তখন একসাথে হত না। ফলে, আলজেরিয়া-চিলি ম্যাচটা হয়ে গিয়েছিল আগেরদিন, আর তার পরের দিন আলজেরিয়া-চিলি ম্যাচের ফল জেনেই মাঠে নেমেছিল পশ্চিম জার্মানি আর অস্ট্রিয়া। পশ্চিম জার্মানি আর অস্ট্রিয়া মাঠে নামার আগেই জেনে গেল পরবর্তী রাউণ্ডে উঠতে গেলে তাদেরকে কি করতে হবে, কত গোলের ব্যবধানে জিততে হবে কি সমাচার। দুই দলই জানত, ১-০ বা ২-০ গোলের ব্যবধানে পশ্চিম জার্মানি জিতলে অস্ট্রিয়া ও পশ্চিম জার্মানি, দুই দলই উঠবে পরবর্তী রাউণ্ডে। কিন্তু তাঁর থেকে বেশী গোলে জিতলে পশ্চিম জার্মানির সাথে পরবর্তী রাউণ্ডে উঠবে আলজেরিয়া – কেননা অস্ট্রিয়ার থেকে আলজেরিয়া ইতোমধ্যে গোল বেশী দিয়ে রেখেছে, অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়ার গোল ব্যবধান সমান হলেও অস্ট্রিয়ার জায়গায় আলজেরিয়াই উঠবে পরবর্তী রাউণ্ডে, পশ্চিম জার্মানির সাথে। তাই শেষ ম্যাচের দুই দল পশ্চিম জার্মানি আর অস্ট্রিয়া রচনা করলো বিশ্বকাপ ইতিহাসের এক ন্যাক্কারজনক অধ্যায়, দশ মিনিটের মধ্যেই জার্মানি এক গোল দিয়ে দিলেও, পরে আশি মিনিট দুটো দলের মধ্যে গোল দেওয়ার কোন চেষ্টাই করতে দেখা গেল না! নিজেদের অর্ধে নিজেদের মধ্যে বল টুক টুক করে বল পাস করতে লাগলো তারা, আক্রমণ করার ইচ্ছার লেশমাত্রও দেখা গেল না। সেই ম্যাচ দেখতে আসা প্রত্যেকটা দর্শক, সাংবাদিক সেদিন বুঝেছিল কি হচ্ছে মাঠে। মাঠে খেলা দেখতে আসা উদগ্রীব আলজেরিয়ার সমর্থকেরা মাঠে টাকার নোট ছুঁড়তে থাকে, “পাতানো ম্যাচ”, “পাতানো ম্যাচ” বলে চিৎকার করতে থাকে। এমনকি বিরক্ত হয়েছিল জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার অনেক সমর্থকও। এক জার্মান ভক্তকে দেখা যায় নিজের দেশের পতাকা পোড়াতে। ফলে বাদ পড়তে হয় উদ্যমী আলজেরিয়াকে, ম্যাচটা এখনো – “ডিসগ্রেস অফ গিহন” নামে পরিচিত!
- ইতালি-দক্ষিণ কোরিয়া : ২০০২ বিশ্বকাপ
ফ্রান্সেসকো টট্টি, দেল পিয়েরো, বুফন, গাত্তুসো, ভিয়েরি সমৃদ্ধ প্রতিভাবান ইতালি দল ২০০২ সালে বিশ্বকাপ জিততে পারে, এমনটাই ভেবেছিলেন অনেকে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দ্বিতীয় রাউন্ডে কোরিয়ার কাছে হেরে বিদায় নেয় ইতালি। ১৮ মিনিটে ইতালিয়ান স্ট্রাইকার ভিয়েরির দেওয়া গোলটা ৮৮ মিনিটে শোধ করে দেন সিউল কি-হিউন। পরে ১১৮ মিনিটের ‘গোল্ডেন গোল’ করে ইতালিকে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে ফেলেন আন জুন-হুয়ান। কিন্তু আন জুন-হুয়ান নন, এই ম্যাচে সবাই মনে রেখেছে রেফারি বায়রন মরেনোকে।
জঘন্যতম রেফারিং করেছিলেন মরেনো। ইতালিয়ানরা তো আজও তাঁকে শাপ-শাপান্ত করে! ইকুয়েডরের এই রেফারি বেশ কিছু ভুল সিদ্ধান্ত দেন যার মাশুল গুনতে হয়েছিল ইতালিকে। অতিরিক্ত সময়ে ড্যামিয়ানো টমাসির গোল খামোখাই অফসাইড ডেকেছিলেন মরেনো। এ ছাড়া বিনা কারণে টট্টিকে লাল কার্ড দেখান তিনি। ইতালি তো ম্যাচটা হেরে গিয়েছিল আসলে এই দুই সিদ্ধান্তের পরই! আন-জুন হুয়ানের গোলটা শুধু কাজ করেছিল কফিনে শেষ পেরেক হিসেবে। যার ফলে তারকায় ঠাসা এক দল নিয়েও দ্বিতীয় রাউন্ড থেকেই বিদায় নিতে হয় ইতালিকে—শুধু ন্যাক্কারজনক রেফারিংয়ের জন্য!