যেভাবে এক বিন্দুতে মিলে গেলেন শাকা-শাকিরি!

আমরা বাংলাদেশী। বাংলাদেশী হলেও আমাদের দেশেই অনেক মানুষ আছেন যারা বাংলাদেশ ছাড়াও বিভিন্ন খেলায় ভারত বা পাকিস্তানকে সমর্থন দিয়ে থাকেন। ইন্টারনেটের দুনিয়ায় এ নিয়ে একটা বেশ মজার কৌতুকও প্রচলিত আছে, “খেলার সাথে রাজনীতি মেশাবেন না”, অর্থাৎ খেলার জায়গায় খেলা, বাংলাদেশ-পাকিস্তানের তিক্ত ইতিহাসের জায়গায় সেটা। বাংলাদেশ নিবাসী পাকিস্তানের সমর্থকরা এই বলেই নিজেদের সমর্থনকে খানিক বৈধতা দিতে চান যেন। তাদের বক্তব্য, খেলার মত মন হালকা করা, অবসরকে রঙ্গিন করা জিনিসের সাথে রাজনীতি-দাঙ্গা এসব সিরিয়াস ইস্যু মেশাবো কেন?

দেশের সেসব মানুষ কালকে সার্বিয়া-সুইজারল্যান্ডের মধ্যকার ম্যাচটা দেখলে হয়তো একটু হলেও বুঝতে পারতেন, কেন খেলার সাথে রাজনীতি মেশানো হয়!

গ্রানিত শাকা আর জের্দান শাকিরির দুই গোলে প্রথমে পিছিয়ে পড়েও পরে সার্বিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়েছে সুইজারল্যান্ড। আপাতদৃষ্টিতে আমরা দেখেছি সুইজারল্যান্ডের তিন পয়েন্ট পাওয়া, কিন্তু এই দুই গোলের পেছনের ইতিহাস সম্পর্কে কতজন জানি আমরা?

যুগোস্লাভিয়ার জাতিগত দাঙ্গায় কত শরণার্থী যে মাতৃভূমি ছেড়ে সুইজারল্যান্ডে আশ্রয় নিয়েছিলেন তার ইয়ত্তা নেই। যুগোস্লাভিয়া সরকার হয়ত বুঝতে পেরেছিল, দেশে ভাঙ্গন আসন্ন। তাই দেশদ্রোহী হবার অপরাধে অগণিত কসোভো আলবেনিয়ানকে বিনা বিচারে আটকে রাখা হত সার্বিয়ার কারাগারগুলোতে। নব্বই দশকের শেষ দিকে হওয়া যুগোস্লাভ সরকারবিরোধী সেই আন্দোলনে আর দশজন দেশপ্রেমিক অধিবাসীর মত রাগিপ শাকাও যোগ দিয়েছিলেন। বাইশ বছর বয়সী সদ্যবিবাহিত রাগিপ শাকার গায়ে তখন তারুণ্যের উদ্দামতা, টগবগ করে ফুটছে রক্ত, কসোভোতে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অফ প্রিস্টিনার বুদ্ধিদীপ্ত ছাত্র তিনি। উদ্যমী তরুণরা যে চাইলেই ইতিহাস বদলে দিতে পারে, সে ব্যাপারে ভালোই ধারণা ছিল যুগোস্লাভ সরকারের। তাই দমননীতির আশ্রয় নিলো তারা। সেই দমননীতিতে পিষ্ট করার চেষ্টা করা হল রাগিপ শাকার মত আন্দোলনকারী সকল তরুণকে। সার্বিয়ার এক জেলে বন্দী হলেন শাকা। দেশদ্রোহের অপরাধে ছয় বছরের জেল হল তাঁর। জেলের একটা প্রকোষ্ঠে চারজনের সাথে চাপাচাপি করে থাকতে হত তাকে। প্রতিদিন মাত্র দশ মিনিটের জন্য জেলের ঐ প্রকোষ্ঠ থেকে বের হয়ে সূর্যের মুখ দেখতে পারতেন রাগিপ। কি কষ্ট, কি কষ্ট!

তিন বছর পর যুগোস্লাভ সরকারের মায়া হল, এক শর্তের বিনিময়ে জেল থেকে মুক্তি মিললো রাগিপের। কি সেই শর্ত?

ছাড়তে হবে দেশ। নিজের আর নিজের পরিবারের ভবিষ্যত সুরক্ষার কথা চিন্তা করে নিজের মধ্যকার দেশপ্রেমকে দমিয়েই যেন রাখলেন রাগিপ। স্ত্রী এলমাজকে নিয়ে পাড়ি জমালেন সুইজারল্যান্ডে, যুদ্ধ শুরু আগেই।

নামের শেষ অংশ দেখেই হয়তো বুঝতে পেরেছেন আগেই, গ্রানিত শাকার বাবার জীবন সম্পর্কেই বলা হচ্ছে এখানে। নিজের দেশ থেকে উৎখাত হওয়া রাগিপ আর এলমাজ সুইজারল্যান্ডেই সবকিছু ভুলে নিজেদের জীবনটা নতুন করে শুরু করতে চাইলেন। সুইজারল্যান্ডে এসে রাগিপ কাজ নিলেন একটা বাগানে, মালী হিসেবে। ততদিনে ঘর আলো করে চলে এসেছে দুই সন্তান – তলান্ত ও গ্রানিত।

জের্দান শাকিরির কাহিনীটাও ভিন্ন কিছু নয়। জন্ম কসোভোতে হলেও জাতিগত বিদ্বেষের দাঙ্গার হাত থেকে পরিবারকে বাঁচাতে শাকিরির বাবা-মা চলে এসেছিলেন এই সুইজারল্যান্ডেই। সুইজারল্যান্ডেই শুরু করেছিলেন নিজেদের জীবনের নতুন অধ্যায়।

এই এক বিন্দুতেই মিলে গেছিলেন শাকা-শাকিরি। কালকে যেমন আবারো আরেক বিন্দুতে মিলে গেলেন এই দুইজন। ‘চিরবৈরি’ সার্বিয়ার বিপক্ষে গোল করে ছিনিয়ে আনলেন অমূল্য এক জয়, ফুটবল মাঠেই প্রমাণ করলেন নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব। আর সাথে নিজেদের উদযাপনেও এনেছিলেন আলবেনিয়ান জাতীয়তাবাদের পরিচায়ক ঈগলের ছোঁয়া, প্রথমে গ্রানিত শাকা, পরে জের্দান শাকিরি, দুই হাত উলটে বুকের কাছে এনে ‘ক্রস’ করে ঈগলের ডানার মত বানিয়ে শাকা-শাকিরি যেন নিঃশব্দেই প্রমাণ করেছিলেন কালকে, সুইজারল্যান্ড তাঁদের নতুন জীবন দান করলেও, এই জীবনের সূচনা কিন্তু হয়েছিলো আলবেনিয়া-কসোভোতেই! কাকতালীয় হলেও সত্য, ম্যাচের আগে সার্বিয়ার বিপক্ষে প্রথম গোল করা এই আলেক্সান্দার মিত্রোভিচই সুইস দলে শাকা-শাকিরির মত খেলোয়াড়দের আলবেনিয়া ও কসোভো প্রীতি নিয়ে বলেছিলেন, “এতই যদি দেশের প্রতি দরদ হয়, তাহলে কসোভো বাদ দিয়ে সুইজারল্যান্ডের হয়ে খেলতে আসলো কেন তারা?”

নিজেদের কসোভো-আলবেনিয়ান পরিচয়ের শিকড়টা এভাবেই ভুলতে পারেন না শাকা-শাকিরিরা। যে কারণে প্রায় সময়ই দেশের মানুষের কাছ থেকে শুনতে হয় “যথেষ্ট দেশপ্রেমী নয়” এই খোঁটাও! গ্রানিতের ভাই তলান্ত তো আবার এককাঠি সরেস, এই ‘দ্বৈত’ জাতীয়তাবাদের ঝামেলা এড়াতেই নিজের জন্মস্থানকেই বেছে নিয়েছেন তিনি, সুইজারল্যান্ডের বয়সভিত্তিক দলগুলোতে ফুটবলের পাঠ নিলেও এখন আলবেনিয়ার মূল দলের খেলোয়াড় হিসেবেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি! তবে সুইসরাও জানে, নিজেদের দলের প্রায় অধিকাংশ খেলোয়াড়ের সাথেই এরকম শরণার্থীর পরিচয়টা জুড়ে আছে, অধিকাংশ খেলোয়াড়েরই টান আছে কসোভো-আলবেনিয়ার প্রতি, এমনকি জাতীয় দলের অধিকাংশ খেলোয়াড়েরা সুইজারল্যান্ডের জাতীয় সঙ্গীতটাও গাইতে পারেনা এখনো ঠিকমত, তাই এ নিয়ে বেশী বাড়াবাড়িও করে না তেমন তারা। গ্রানিত শাকা, জের্দান শাকিরি, ব্লেরিম জেমাইলি – সবার কাহিনীই তো মোটামুটি এক!

ম্যাচ শেষে নিজের উদযাপন সম্পর্কে মুখ খোলেননি শাকা-শাকিরিরা, যদি দেশদ্রোহের খোঁটা আবার শোনা লাগে? যদি আবারো ফিফার পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞা চলে আসে? কিন্তু প্রত্যেকবার সার্বিয়ার বিপক্ষে গোল করার পর তাদের হৃদয় যেভাবে উন্মুক্ত হয়ে কসোভো-আলবেনিয়ার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করে, সে ভালোবাসায় কিভাবে বাঁধ দেবেন শাকা-শাকিরিরা?

*জুন ২৩, ২০১৮ তারিখে গোল্লাছুট ডটকমে প্রকাশিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Post

Got a PROJECT

IN MIND?

©2024 Nishat Ahmed Zishan, All Rights Reserved.

Developed by Asif Mollik