ফলস নাইন – পরিচয় ও আদ্যোপান্ত

ফ্রান্সের বিপক্ষে বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচে গঞ্জালো হিগুয়াইন বা সার্জিও অ্যাগুয়েরোর মত কোন প্রথাগত স্ট্রাইকার খেলাতে চাচ্ছেন না সাম্পাওলি। ৪-৩-৩ ফর্মেশনে স্ট্রাইকারের ভূমিকা দেওয়া হতে পারে অধিনায়ক লিওনেল মেসিকে। কিন্তু ফলস নাইন জিনিসটা কি আসলে?

একটু দীর্ঘ উপক্রমণিকা টানতে ইচ্ছে হচ্ছে।

টাইম মেশিনে করে ২০১৭ সাল থেকে ২০০৭ সালে ফিরে যাওয়া যাক। ইতালিতে তখন দুই মিলান ক্লাব – ইন্টার মিলান ও এসি মিলান ক্লাবের আধিপত্য। ২০০৭ সালে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতলো এসি মিলান, আর ঘরোয়া লীগে জুভেন্টাসের ম্যাচ পাতানোর শাস্তির সুবাদে সিরি আ এর একচ্ছত্র আধিপত্য চলে আসলো রবার্তো মানচিনির ইন্টার মিলানের হাতে।

কিন্তু এসি মিলান, জুভেন্টাস বা ইন্টার মিলান নয় – তখন সঙ্গোপনে অন্য আরেক ইতালিয়ান ক্লাবের ট্যাকটিকস বোর্ডে সৃষ্টি হচ্ছিলো যুগান্তকারী এক ধারণার। যে ধারণার মূল কুশীলব ছিলেন ইতালিয়ান কোচ লুসিয়ানো স্প্যালেত্তি। বর্তমানে ইন্টার মিলানের দায়িত্বে থাকা এই ম্যানেজার তখন ছিলেন এএস রোমার দায়িত্বে। আর রোমার হয়েই স্প্যালেত্তি তখন আবিষ্কার করছিলেন নতুন এক চমকপ্রদ ট্যাকটিকসের।

ফুটবল বিশ্বের অধিকাংশ দলই তখন ৪-৪-২, কিংবা ৪-৩-৩ কিংবা খুব বেশী হলে ৪-২-৩-১ ফর্মেশানে খেলে। লুসিয়ানো স্প্যালেত্তির রোমাও তখন খেলত ৪-২-৩-১ ফর্মেশানে। সামনের একক ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলার দায়িত্ব ছিল মিশরীয় স্ট্রাইকার মিডো, নাহয় ইতালিয়ান স্ট্রাইকার ভিনসেঞ্জো মন্তেয়া, আরেক ইতালিয়ান স্ট্রাইকার ফ্র্যানসেস্কো তাভানো – এদের মধ্যে যেকোন একজনের। আর কিংবদন্তী ফ্র্যানসেস্কো টট্টি খেলতেন ঠিক সেই একক স্ট্রাইকারের পেছনে, ”ট্রেকোয়ার্টিস্টা” কিংবা সেন্ট্রাল অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে। কিন্তু ঝামেলা বাঁধল যখন স্প্যালেত্তির প্রত্যেকটা স্ট্রাইকারই একসাথে ইনজুরিতে পড়ল তখন। মিডো, মন্তেলা, ওকাকা- সবাই-ই ইনজুরির কারণে মাঠের বাইরে। কি হবে এখন? এই বড় ঝামেলার সময়ে স্প্যালেত্তিকে উদ্ধার করলো তাঁর তুখোড় ফুটবল মস্তিষ্ক। তিনি জানতেন তাঁর হাতে রয়েছে ইতালিয়ান ফুটবলের রাজপুত্র ফ্র্যানসেস্কো টট্টির মত একজন খেলোয়াড়। টট্টিকে বললেন সেই একক স্ট্রাইকারের ভূমিকায় খেলতে। কিন্তু স্কোয়াডের অন্যান্য স্ট্রাইকাররা যেভাবে খেলতেন, ঠিক সেভাবে না। টট্টি তাঁর স্বভাবজাত ট্রেকোয়ার্টিস্টা হিসেবেই খেলবেন মূলত, কিন্তু তাঁর সামনে আর অন্য কোণ স্ট্রাইকার থাকবেনা এই ফর্মেশানে। টট্টিই হবেন দলের আক্রমণের মূল ফোকাস। স্ট্রাইকার বা আদর্শ ”নাম্বার নাইন” এর জায়গাতে খেলেও টট্টি ঠিক ”নাম্বার নাইন” হিসেবে খেলবেন না। একজন আদর্শ নাম্বার নাইনের বা সেন্টার ফরোয়ার্ডের মত ডিবক্সের মধ্যে বসে না থেকে অন্য অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের সহায়তার জন্য অপেক্ষা না করে তাঁর ভূমিকাটা হবে ট্রেকোয়ার্টিস্টারই, অর্থাৎ নিচে নেমে তাঁকে যথারীতি প্লেমেকিং এর কাজটা করতে হবে, তাঁর অবস্থানটা হবে প্রতিপক্ষের সেন্ট্রাল ডিফেন্স ও সেন্ট্রাল মিডফিল্ডের মাঝে। এই পরিকল্পনাটা বাস্তবায়ন করার জন্য স্প্যালেত্তি নিজের ৪-২-৩-১ ফর্মেশানকে বদলালেন না। বরং একটু উন্নত করলেন। তাঁর নতুন এই ফর্মেশানটা হল অনেকটা ৪-৬-০ বা আরেকটূ স্পষ্ট করে বললে, ৪-৫-১-০ এর মত। উপরে প্রথাগত কোন টার্গেটম্যান থাকবেন না, টট্টি খেলবেন তাঁর স্বভাবত সেন্ট্রাল অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবেই, কিন্তু ভূমিকা পালন করবেন একজন আদর্শ সেন্টার ফরোয়ার্ডের মত আক্রমণের মূল ফোকাস পয়েন্ট হিসেবে। নিচে পাঁচজন মিডফিল্ডারের মধ্যে মন্টিনিগ্রিয়ান খেলোয়াড় মির্কো ভুচিনিচ খেলবেন বাম মিডফিল্ডার ও ব্রাজিলিয়ান উইঙ্গার মানচিনি খেলবেন ডান মিডফিল্ডার হিসেবে, পেছনে তিনজন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারের ভূনিকায় থাকবেন চিলিয়ান সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার ডেভিড পিজারো, আর দুই ইতালিয়ান সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার সিমোনে পেরোত্তা ও ড্যানিয়েলে ডি রসি। পিজারো আর ডি রসি থাকবেন একটু পেছনে, ডিফেন্সের সামনে, তাদের সামনে হবে সিমোনে পেরোত্তার অবস্থান, এমনভাবে পেরোত্তার অবস্থানটা হবে যেন সেটা ফ্র্যানসেস্কো টট্টির ট্রেকোয়ার্টিস্টা অবস্থানের সাথে সংঘর্ষ না ঘটায়।

এই অসাধারণ আবিষ্কারের ফলে প্রতিপক্ষের যে সমস্যা হল, সেটা হল রোমার কোন প্রথাগত টার্গেটম্যান বা সেন্টার ফরোয়ার্ড না থাকার কারণে প্রতিপক্ষের দুই সেন্ট্রাল ডিফেন্ডাররা মার্ক করার মত কাউকে পেলেন না, কারণ টট্টি খেলছেন প্রথাগত টার্গেটম্যানের অবস্থানের থেকে একটু পেছনে, ফলে টট্টিকে মার্ক করতে গিয়ে প্রতিপক্ষের সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারদের নিজেদের ডিফেন্স লাইন থেকে উঠে এসে মার্ক করতে হত, আবার মিডফিল্ডে টট্টি ছাড়াও আরও পাঁচজন থাকার ফলে (যাদের মধ্যে দুইজন আবার উইঙ্গার হিসেবে দুই সাইডে খেলছেন) প্রতিপক্ষের মিডফিল্ডাররাও এক্ষেত্রে তাঁদের নিজেদের সেন্ট্রাল ডিফেন্সকে সহায়তা করতে পারতেন না। ফলে প্রত্যেক ম্যাচেই রোমার বল দখলের হারটা প্রতিপক্ষের চেয়ে বেশী হতে থাকলো, রোমা হয়ে উঠলো আরও আক্রমণাত্মক। মূলত স্ট্রাইকার হিসেবে খেলা মির্কো ভুচিনিচকে এই ফর্মেশানে স্প্যালেত্তি লেফট উইঙ্গার হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করলেন, যাতে উইং থেকেও গোল আসে। টট্টি নিচে নেমে খেলার কারণে টট্টি দ্বারা যতটুকু জায়গা উপরে ফাঁকা হচ্ছিল, সেটা পূরণ করার জন্য দুইপাশ থেকে দুই উইঙ্গার ক্রমাগত উপরে চলে যেত।

রোমা স্কোয়াডে টট্টি আর ড্যানিয়েলে ডি রসি ছাড়া সেরকম কেউই বিশ্বমানের না হবার কারণে এই অসাধারণ আবিষ্কারটা দিয়েও রোমা বেশী ট্রফি জিততে পারেনি, শুধু জিতেছিল একটি সুপারকোপা ইতালিয়ানা আর একটু কোপা ইতালিয়া। কোপা ইতালিয়া ফাইনালের দুই লেগে তৎকালীন লিগ চ্যাম্পিয়ন ইন্টার মিলানকে দুই লেগ মিলিয়ে ৭-৩ গোলে হারিয়ে লুসিয়ানো স্প্যালেত্তি প্রমাণ করেন তাঁর এই আবিষ্কারটা ‘ফ্লুক’ ছিল না কিছু, কিন্তু নিয়মিত সফলতা পাননি তিনি এই ফর্মেশানে, কেননা দুর্ভাগ্যবশতঃ, যেটা বললাম, তাঁর হাতে সেরকম বিশ্বমানের স্কোয়াড ছিলনা।

টট্টির অবস্থানের জন্য এই ফর্মেশানের নামই হয়ে যায় “ফলস নাইন” ফর্মেশান, আর টট্টির পজিশানটার নাম হয়ে যায় “ফলস নাইন” পজিশান।

এই ফর্মেশান ব্যবহার করে এএস রোমা বেশী কিছু না জিতলেও ইতালির পশ্চিমে আরেক ইউরোপিয়ান দেশের এক উঠতি ম্যানেজারের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিল এই ট্যাকটিকসটা। তিনি পেপ গার্দিওলা, স্পেইনের বার্সেলোনার ইতিহাসের অন্যতম সফল এই ম্যানেজার তখন ফ্র্যাঙ্ক রাইকার্ডের হাত থেকে বার্সার ম্যানেজারের ব্যাটনটা নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অপেক্ষায়। ২০০৬ সালে চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতা ও রোনালদিনহো কাঁধে ভর করে স্পেইনে বার্সার রাজত্ব কায়েম করা ফ্র্যাঙ্ক রাইকার্ড যথারীতি দলকে ৪-৩-৩ ফর্মেশানেই খেলাতে পছন্দ করতেন। কিন্তু ২০০৬ সালের পর টানা দুই মৌসুম কিছু না জিততে পারা বার্সেলোনা কোচ করে নিয়ে আসে নিজেদের সাবেক সফল খেলোয়াড় পেপ গার্দিওলাকে। পেপ গার্দিওলা যথারীতি ৪-৩-৩ ফর্মেশান বজায় রাখলেও কি হবে? তাঁর মাথায়ও তো চলছিলো তখন ফলস নাইনের খেলা!

রাইকার্ডের আমলে ৪-৩-৩ ফর্মেশানের উপরের তিনজনের মাঝে একদম মধ্যে ও সবচাইতে উপরে সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলা ক্যামেরুনিয়ান স্ট্রাইকার স্যামুয়েল ইতোকে ক্লাবে আসার সাথে সাথেই বিক্রি করে দেওয়ার চেষ্টা করলেন তিনি (প্রথম মৌসুমে পারেননি যদিও, পরে গার্দিওলার প্রথম মৌসুমে ইতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন)! ৪-৩-৩ ফর্মেশানে আনলেন পরিবর্তন, স্প্যালেত্তির ৪-৬-০ বা ৪-৫-১-০ ফর্মেশানের ফলস নাইনের আদলে নিজের ৪-৩-৩ ফর্মেশানেও ফলস নাইন নিয়ে আসলেন গার্দিওলা, ফলে ৪-৩-৩ ফর্মেশানটা পরিবর্তিত হয়ে অনেকটা ৪-৩-১-২ এর আকার নিলো। সাধারণত উইঙ্গার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করা লিওনেল মেসি নামক এক পুঁচকে ছোঁড়াকে ফলস নাইন হিসেবে খেলাতে শুরু করলেন গার্দিওলা, দুইপাশে খেলতে লাগলেন স্যামুয়েল ইতো আর আর্সেনাল থেকে আসা কিংবদন্তী ফরাসী স্ট্রাইকার থিয়েরি অঁরি। যদিও কাগজে কলমে দেখানো হত ইতোই খেলছেন মাঝে, কিন্তু আসলে তা ছিলোনা। মেসি মাঝে খেলতেন, কিন্তু মিডফিল্ডে নেমে আসতেন প্রায়ই, মেসির রেখে আসা জায়গায় তাণ্ডব চালাতেন কখনো অঁরি আর ইতো, কখনো পেদ্রো কিংবা ডেভিড ভিয়া, নাহয় বোয়ান কিরকিচ আর জলাতান ইব্রাহিমোভিচ! মেসির বিশ্বসেরা হবার গূঢ় রহস্য নিহিত ছিল এখানেই। আর গার্দিওলার স্কোয়াডটাও স্প্যালেত্তির মত কম প্রতিভাবান ছিল না, তাই ফলস নাইন সিস্টেমটা গার্দিওলাকে পুরষ্কৃতও করলো দু’হাত ভরে। পৃথিবীর নজরে আসলো ফলস নাইন সিস্টেমের বাজিমাত করার ঘটনা।

গার্দিওলার আমলের পর টিটো ভিয়ানোভা আসলেন, আসলেন জর্ডি রৌরা, আসলেন জেরার্ডো মার্টিনো – কেউই মেসিকে তাঁর ঐ ফলস নাইনের ভূমিকা থেকে সরাতে চাননি। অবশেষে স্ট্রাইকার হিসেবে ২০১৪ সালে লুইস সুয়ারেজ আসার পর ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসের এক ম্যাচে এবার তৎকালীন বার্সা কোচ লুইস এনরিকে সুয়ারেজকে সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলানো শুরু করলেন, মেসি চলে গেলেন উইংয়ে। ফলে মেসি, সুয়ারেজ আর নেইমারকে নিয়ে সৃষ্টি হল বিখ্যাত “এম-এস-এন” ত্রয়ীর।

ঠিক এভাবেই মেসির হাত ধরে ফলস নাইন পজিশনটা এই যুগে জনপ্রিয়তা পায়। আগামীকাল ফ্রান্সের বিপক্ষে হয়ত এই পজিশনেই আবারো খেলতে নামছেন মেসি। পাশে অঁরি-ইতো না থাকলেও থাকবেন ডি মারিয়া-পাভন। মেসি পারবেন তো বার্সেলোনার জাদু আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে দেখাতে?

*জুন ৩০, ২০১৮ তারিখে গোল্লাছুট ডটকমে প্রকাশিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Post

Got a PROJECT

IN MIND?

©2024 Nishat Ahmed Zishan, All Rights Reserved.

Developed by Asif Mollik