যত কাণ্ড বিশ্বকাপ ফুটবলে : শুমাখ্যার-ব্যাটিস্টন সংঘর্ষ

আর মাত্র ৩৬ দিন বাকী। ৩৬ দিন পরেই শুরু হবে বিশ্ব ফুটবলের সর্ববৃহৎ মহাযজ্ঞ – বিশ্বকাপ ফুটবল। ১৯৩০ সাল থেকে শুরু হওয়া এই মহাযজ্ঞের একবিংশতম আসর বসছে এইবার – রাশিয়ায়। বিশ্বকাপ ফুটবলের অবিস্মরণীয় কিছু ক্ষণ, ঘটনা, মুহূর্তগুলো আবারও এই রাশিয়া বিশ্বকাপের মাহেন্দ্রক্ষণে পাঠকদের মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য গোল্লাছুট ডটকমের বিশেষ আয়োজন “যত কাণ্ড বিশ্বকাপ ফুটবলে”!

খেলোয়াড় হিসেবে ফরাসী ডিফেন্ডার প্যাট্রিক ব্যাটিস্টনকে বেশ সফলই বলা চলে। তবুও সেইন্ট এতিয়েঁ ও বোর্দোর হয়ে পাঁচবার লিগ জেতা ও ফ্রান্সের হয়ে একবার ইউরো জেতা এই ডিফেন্ডারের ক্যারিয়ারের কাটাছেঁড়া করতে বসলে তাঁর এসব গৌরবান্বিত অধ্যায়গুলোর কথা স্মরণ করা হয়না। কেননা ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপ এ তাঁর সাথে যা হয়েছে তাঁর সাথে যে কোনকিছুরই তুলনা চলে না!

একই কথা বলা চলে জার্মান গোলরক্ষক হ্যারল্ড শুমাখ্যারের বেলাতেও। এফসি কোলনের কিংবদন্তী এই গোলরক্ষক ক্যারিয়ারে জার্মান বুন্দেসলিগা ছাড়াও জিতেছেন তুর্কি লিগ ও ইউরো। তবুও ১৯৮২ বিশ্বকাপ ছাড়া কেউ তাঁর ক্যারিয়ারের ব্যাপারে সেরকম কিছু নিয়েই আলোচনা করতে চান না!

সরাসরি ঘটনায় আসা যাক তাহলে। স্পেইনের সেভিলে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ফ্রান্স বনাম পশ্চিম জার্মানির মধ্যকার সেমিফাইনাল। খেলায় তখন ১-১ গোলের সমতা। ১৭ মিনিটে জার্মান উইঙ্গার পিয়েরে লিটবারস্কির গোল ২৭ মিনিটে পেনাল্টির মাধ্যমে শোধ করে দিয়েছেন ফরাসী মহাতারকা মিশেল প্লাতিনি। দ্বিতীয়ার্ধে ৫০ মিনিটে অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার বারনার্ড জেঙ্ঘিনির বদলে মাঠে নামানো হল ফরাসী ডিফেন্ডার প্যাট্রিক ব্যাটিস্টনকে। আর তাঁর সাত মিনিট পরেই বিশ্ব প্রত্যক্ষ করলো বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি।

মিশেল প্লাতিনির এক ডিফেন্সচেরা পাস খুঁজে নিল সামনে থাকা ফরাসী ডিফেন্ডার প্যাট্রিক ব্যাটিস্টনকে। গোল হয় হয় অবস্থা, ব্যাটিস্টনের সামনে জার্মান গোলরক্ষক হ্যারল্ড শুমাখ্যার ছাড়া আর কেউ নেই। এই সময় একটু এগিয়ে এসে ব্যাটিস্টন এর সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হলেন শুম্যাখার। বল দখল করার কোন ইচ্ছা নেই, যেন একদম ব্যাটিস্টনকে আঘাত করার জন্যই এগিয়ে এসেছেন তিনি। ঝাঁপিয়ে পড়া শুমাখ্যারের পিছন দিকের সাথে ব্যাটিস্টনের মুখের মুখোমুখি সংঘর্ষ হল। ফলাফল যা হবার তাই, তিন-তিনটা দাঁত ভেঙে গেল ব্যাটিস্টনের, ভাংলো পাঁজরের হাড়, ক্ষতিগ্রস্থ হল মেরুদণ্ড। সংঘর্ষের সাথে সাথে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন ব্যাটিস্টন, অচেতন হয়ে গেলেন। ডাক্তাররা মাঠে ছুটে এসে দেখলেন ব্যাটিস্টনের চেতনা নেই, কারণ সংঘর্ষের সাথে সাথেই কোমায় চলে গিয়েছিলেন ব্যাটিস্টন। এমনকি অচেতন ব্যাটিস্টনের ফ্যাকাশে চেহারা দেখে মিশেল প্লাতিনি ভেবেছিলেন ব্যাটিস্টন মরেই গেছেন বুঝি!

এদিকে আরেক আশ্চর্য কাণ্ড করেন শুম্যাখার, পুরা মাঠের সব খেলোয়াড় ও অফিসিয়াল যেখানে ব্যাটিস্টনের অবস্থা জানার জন্য ব্যস্ত, শুম্যাখার নিজে একবারো বাটিস্টনের অবস্থা জানার জন্য এগিয়ে জাননি! পরে তিনি তাঁর আত্মজীবনী “কিক-অফ” এ লিখেছিলেন ব্যাটিস্টনের পাশে যুদ্ধংদেহী ভঙ্গিমায় কয়েকজন ফরাসী খেলোয়াড় ছিলেন বিধায় কাছে গিয়ে ব্যাটিস্টনের অবস্থা জানার মত সাহস হয়নি তাঁর! আরও আশ্চর্যের ব্যাপার ছিল, এই বিশাল কাণ্ডের জন্য শুমাখ্যারকে লাল কার্ড দেখানো তো দূর, ফাউলই দেননি রেফারি চার্লস করভার! আরেকটা ঘটনা হয়েছিল এর মাঝেই, খেলাটা সেভিয়ায় হয়েছিল, আর সেভিয়ার পুলিশ রেড ক্রস কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল সেই সময়ে। ফলে মাঠে ব্যাটিস্টন মাঠে অনেকক্ষণ অচেতন হয়ে পড়ে থাকলেও সময়মত সেবাশুশ্রূষা পাননি।
এই ঘটনায় ফরাসী ফুটবলে মোটামুটি একটা নবজাগরণ আসে। ফরাসী ম্যানেজার জেরার্ড হুলিয়ারের মতে, এই ঘটনাটা ফরাসী জাতিকে একতাবদ্ধ হতে সাহায্য করে, ফুটবলকে আরও ভালোবাসতে সহায়তা করে, যা তাদেরকে ১৯৮৪ ইউরো জিততে সহায়তা করে। আর ওদিকে হ্যারল্ড শুম্যাখার ফরাসীদের কাছে এতটাই ঘৃণিত হয়েছিলেন যে, ২০০২ সালের এক জরিপে উঠে আসে যে নাৎসি একনায়ক অ্যাডলফ হিটলার নন, শুম্যাখারকেই সবচেয়ে বেশী ঘৃণা করে ফরাসীরা!

*মে ১১, ২০১৮ তারিখে গোল্লাছুট ডটকমে প্রকাশিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Post

Got a PROJECT

IN MIND?

©2024 Nishat Ahmed Zishan, All Rights Reserved.

Developed by Asif Mollik