যত কাণ্ড বিশ্বকাপ ফুটবলে : মুখের কথায় বিদ্ধ রেফারি!

আর মাত্র ৩৫ দিন বাকী। ৩৫ দিন পরেই শুরু হবে বিশ্ব ফুটবলের সর্ববৃহৎ মহাযজ্ঞ – বিশ্বকাপ ফুটবল। ১৯৩০ সাল থেকে শুরু হওয়া এই মহাযজ্ঞের একবিংশতম আসর বসছে এইবার – রাশিয়ায়। বিশ্বকাপ ফুটবলের অবিস্মরণীয় কিছু ক্ষণ, ঘটনা, মুহূর্তগুলো আবারও এই রাশিয়া বিশ্বকাপের মাহেন্দ্রক্ষণে পাঠকদের মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য গোল্লাছুট ডটকমের বিশেষ আয়োজন “যত কাণ্ড বিশ্বকাপ ফুটবলে”!
আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড বৈরিতা নতুন কিছু নয়। ফুটবলে এই দল মুখোমুখি হওয়া মানেই শ্বাসরুদ্ধকর কোন ঘটনার অপেক্ষা করা। সেই ১৯৮৬ বিশ্বকাপ এ ম্যারাডোনার “হ্যান্ড অফ গড”, কিংবা তাঁর সেই বিশ্বসেরা গোল, অথবা ১৯৯৮ সালে ডেভিড বেকহ্যামের লাল কার্ড পাওয়া কিংবা ২০০২ সালে সেই বেকহ্যামের পেনাল্টিতেই আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ থেকে বাদ হয়ে যাওয়া – যুগে যুগে বিভিন্ন বিশ্বকাপ এ এই দুই দল দুইদলকে আঘাত করেছে ভালোভাবেই। তাঁর উপর ফকল্যান্ড দ্বীপের মালিকানা অর্জনের জন্য ১৯৮২ সালে এই দুই জাতির মধ্যে যুদ্ধ এদের বৈরিতাকে দিয়েছে এক নতুন মাত্রা। তবে এই দুই দলের ফুটবল বৈরিতার সূচনাটা কবে থেকে কেউ জানেন কি? সেটা কিন্তু ম্যারাডোনার সমালোচিত “হ্যান্ড অফ গড” গোল থেকে নয়। এই বৈরিতার সূচনা হয়েছিল আরও ২০ বছর আগে থেকে।
১৯৬৬ বিশ্বকাপ ইংল্যান্ড জেতে, এ কথা সবারই জানা। কিন্তু সে বিশ্বকাপ জেতার জন্য যে একের পর এক বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল তারা, সেটাও সবার জানা। গ্রুপপর্বে দ্বিতীয় হবার কারণে কোয়ার্টার ফাইনালে অপেক্ষাকৃত কঠিন দল স্বাগতিক ইংল্যান্ডকে পায় আর্জেন্টিনা। এই আর্জেন্টিনা দলের অধিনায়ক ছিলেন বোকা জুনিয়র্সের কিংবদন্তী ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার আন্তোনিও রাতিন। অনেকের মতেই সেবারের আর্জেন্টিনা দলটা টুর্নামেন্টের সবচেয়ে শক্তিশালী দল ছিল। ডিফেন্সে সিলভিও মার্জোলিনি, মিডে আন্তোনিও রাতিন, স্ট্রাইকে লুইস আর্তিমে – বেশ ভীতিজাগানিয়া দলই ছিল আকাশী সাদারা। তবে ইংল্যান্ডও দুর্বল কোন দল ছিল না। গর্ডন ব্যাঙ্কস, নবি স্টাইলস থেকে শুরু করে জ্যাক ও ববি চার্লটন, ববি মুর, ইয়ান ক্যালাহান, রজার হান্ট, জিওফ হার্স্ট – মহারথীদের মিলনমেলা ছিল ইংল্যান্ড দলেও। কিন্তু এই দুই দলের মহারথীরা কোয়ার্টার ফাইনালকে নিজেদের কারিকুরি দিয়ে স্মরণীয় করে রাখবেন কি, জার্মান রেফারি রুডোলফ ক্রাইটলিন নিজেই সবাইকে ছাপিয়ে আলোচিত ব্যক্তিত্ব হতে চাইলেন। প্রথম থেকেই ইংল্যান্ডকে সমানে সুবিধা দেওয়া শুরু করলেন তিনি। আন্তোনিও রাতিন সেটার প্রতিবাদ করা শুরু করতেই বিধি বাম!
৩৫ মিনিটে রাতিনকে লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বের হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন রেফারি রুডোলফ ক্রাইটলিন!
কারণ? রাতিন বলে তাঁর মুখের ভাষা দিয়ে ক্রাইটলিনকে আঘাত করতে চেয়েছেন! যদিও বলা বাহুল্য, ক্রাইটলিন আর রাতিনের ভাষাগত পার্থক্য অবশ্যই ছিল, ক্রাইটলিনের ইংলিশ বা জার্মান ভাষা রাতিন যেরকম বুঝতেন না, রাতিনের স্প্যানিশ বোঝার সাধ্যও ক্রাইটলিনের ছিল না। তবুও কিভাবে ক্রাইটলিন বুঝলেন রাতিন তাঁকে গালিগালাজ করছেন সেটা একটা গবেষণার বিষয়ই বটে!
লাল কার্ড খাওয়ার পরে রাতিন বারবার নিজের অধিনায়কত্বের আর্মব্যান্ড দেখিয়ে রেফারির কাছে একটা ইন্টারপ্রেটর বা দোভাষীর জন্য আবেদন করেছিলেন, যাতে রাতিন বুঝতে পারেন আসলে কেন রাতিনকে মাঠ থেকে বের হতে বলা হয়েছে। কিন্তু সেটা তিনি পাননি। পুরো আট মিনিট মাঠে খেলা বন্ধ ছিল, কেননা রাতিন মাঠ ছাড়তে চাননি। একসময় মনে হচ্ছিল পুরো আর্জেন্টাইন দলই খেলা বয়কট করে বের হয়ে যাবে, যদিও তা হয়নি।

রাতিন পরে প্রতিবাদস্বরূপ ইংল্যান্ডের রানী এলিজাবেথের জন্য পাতা মাঠের পাশে লাল গালিচায় বসে পড়েন, আবার উঠে গিয়ে মাঠ থেকে বের হবার সময় মাঠের পাশে স্থাপন করা ইংল্যান্ডের পতাকা হাত দিয়ে খানিক দুমড়ে-মুচড়ে দেন, তা দেখে ইংলিশ দর্শকেরা তাঁর দিকে চকলেট বার ছুড়ে মারেন, সে চকলেট বার আবার উঠিয়ে নিজে একটু খেয়ে আবার দর্শকদের দিকে ছুঁড়ে মারেন রাতিন – কি হয়নি সেই ম্যাচে!
জিওফ হার্স্টের একমাত্র গোলে পরে সেই বিতর্কিত ম্যাচ জিতে সেমিফাইনালে ওঠে ইংলিশরা। টুর্নামেন্ট শেষে বেরিয়ে আসে আরও ভয়াবহ তথ্য!
প্রথগম রাউন্ডের ম্যাচগুলো শেষ হবার পর কোয়ার্টার ফাইনালের কোন ম্যাচে কে কে রেফারি থাকবে সেটা নির্ধারণ করার জন্য ফিফা ইংল্যান্ডে আমন্ত্রণ জানায় উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা, স্পেইন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের অফিসিয়ালদের। তারা লণ্ডনে গিয়ে দেখতে পান তারা আসার আগেই কোন ম্যাচে কোন দেশের অফিসিয়াল রেফারি হিসেবে থাকবেন সেটা নির্ধারণ করা হয়ে গিয়েছে! আর এই কাজ করেছেন উপস্থিত থাকা ফিফার ইংলিশ প্রেসিডেন্ট স্ট্যানলি রউস, একজন জার্মান প্রতিনিধি, আর দুইজন আফ্রিকান প্রতিনিধি! পরে দেখা যায় উরুগুয়ে-পশ্চিম জার্মানি ম্যাচে রেফারিং করেছেন এক ইংলিশ রেফারি, আর আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচের রেফারি ছিলেন এই জার্মান রুডোলফ ক্রাইটলিন! বলা বাহুল্য, উরুগুয়ে-পশ্চিম জার্মানি সেমিফাইনালটাও একইরকম বিতর্কিত ছিল!
পরে এই বিতর্কের দিকে আঙ্গুল তুলে এক ডাচ রেফারি বলেন, “ফিফা নিয়ন্ত্রিত হয় তিনজন দ্বারা – স্যার, স্ট্যানলি আর রউস!”

*মে ১০, ২০১৮ তারিখে গোল্লাছুট ডটকমে প্রকাশিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Post

Got a PROJECT

IN MIND?

©2024 Nishat Ahmed Zishan, All Rights Reserved.

Developed by Asif Mollik