যত কাণ্ড বিশ্বকাপ ফুটবলে : ফরাসী বিপ্লব!

আর মাত্র ৪৬ দিন বাকী। ৪৬ দিন পরেই শুরু হবে বিশ্ব ফুটবলের সর্ববৃহৎ মহাযজ্ঞ – বিশ্বকাপ ফুটবল। ১৯৩০ সাল থেকে শুরু হওয়া এই মহাযজ্ঞের একবিংশতম আসর বসছে এইবার – রাশিয়ায়। বিশ্বকাপ ফুটবলের অবিস্মরণীয় কিছু ক্ষণ, ঘটনা, মুহূর্তগুলো আবারও এই রাশিয়া বিশ্বকাপের মাহেন্দ্রক্ষণে পাঠকদের মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য গোল্লাছুট ডটকমের বিশেষ আয়োজন “যত কাণ্ড বিশ্বকাপ ফুটবলে”!
ফরাসী বিপ্লব কি? উইকিপিডিয়া দেখলে আমরা যা বুঝি তা হল, ফরাসি বিপ্লব পুরো বিশ্বের রাষ্ট্রব্যবস্থায় অভুতপূর্ব প্রভাব ফেলেছিল। রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার কৃষক ও শ্রমজীবীদের আন্দোলনের পথিকৃৎ এই বিপ্লব। ফরাসি বিপ্লবের মূলমন্ত্র ছিল সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতা। এই আন্দোলন সংঘটিত হওয়ার পেছনে ফরাসি দার্শনিক ও সাহিত্যিকদের অসামান্য অবদান রয়েছে। পুরো অষ্টাদশ শতাব্দী ধরে ইউরোপে এক বিপ্লবী চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল। তারই ফলাফলে রাজতন্ত্রের পতন ঘটে, গণতন্ত্র শব্দটি পায় নতুন মাত্রা।
সমগ্র বিশ্বের ইতিহাসে তাই এই ফরাসী বিপ্লবের গুরুত্ব অপরিসীম। ২০১০ বিশ্বকাপেও বিশ্ব প্রত্যক্ষ করেছিল এমন আরেকটি ফরাসী বিপ্লব। কিন্তু এই বিপ্লবটা কি ফরাসীর জন্য আগের বিপ্লবটার মত অতটা সম্মানজনক ছিল?

২০০৬ সালের ফাইনালিস্ট ফ্রান্স দু’বছর পর ইউরো ২০০৮ এ সেরকম কিছুই করতে পারেনি। যে ফ্রান্স ১৯৯৮ বিশ্বকাপ ফুটবল শিরোপা অর্জন করার পরে ২০০০ ইউরোও জিতেছিল, সেই ফ্রান্স ২০০৬ সালের ফাইনালে হেরে যাওয়ার পর পরবর্তী ইউরোতেও প্রথম রাউন্ড থেকে বাদ পড়ে যায়। ফ্রান্সের অধঃপতনের এই ধারা বজায় থাকে ২০১০ বিশ্বকাপেও।
বিশ্বকাপে জায়গা পাওয়া থেকে শুরু করে বিশ্বকাপে গ্রুপপর্বের তিন ম্যাচ খেলা, এই যাত্রায় ফ্রান্স দলের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে কালিমা জড়িয়ে ছিল। থিয়েরি অঁরির বিতর্কিত সেই হ্যান্ডবল গোলের সুবাদে বিশ্বকাপ প্লে-অফ এ আয়ারল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পায় ফরাসীরা। চারিদিকে ওঠে নিন্দার ঝড়। কিন্তু তাতে ফ্রান্সের বয়েই গেছে! সে ম্যাচ শেষে দর্শকদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময়, আনন্দ উদযাপন না করেই সরাসরি টানেলে ঢুকে যায় ফরাসী খেলোয়াড়েরা – কে জানে, হয়তো তারা নিজেরাও জানতো গোলটা আসলে হ্যান্ডবলের মাধ্যমেই হয়েছিল!
এক ঝামেলা শেষ হতেই আরেক নতুন ঝামেলায় পড়ে ফরাসীরা। ফ্রান্সের এক নাইটক্লাবে অপ্রাপ্তবয়স্ক যৌনকর্মীদের সাথে যোগাযোগ করার অপরাধে ধরা পড়ে যান ফ্রান্স দলের চার ফুটবলার করিম বেনজেমা, হাতেম বেন আরফা, ফ্র্যাঙ্ক রিবেরি আর সিডনি গোভু। এসবই সংঘটিত হয় ২০১০ বিশ্বকাপ শুরু হবার একটু আগে। হাজারো ঝক্কি পেরিয়ে এদেরকে বিশ্বকাপ খেলাতে নিয়ে যান কোচ রেমন্ড ডমেনেখ। ফ্রান্স দলের অধিনায়ক হিসেবে ঘোষণা করে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের লেফটব্যাক প্যাট্রিস এভরার নাম – যদিও অভিজ্ঞতার কথা চিন্তা করলে এভরার জায়গায় সেবার সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার উইলিয়াম গালাসের অধিনায়কত্ব করার কথা। আগে থেকেই রগচটা হিসেবে পরিচিত গালাস কোচের এই সিদ্ধান্তকে ভালোভাবে নেননি। ২০১০ বিশ্বকাপের পরেই ফ্রান্স জাতীয় দলের দায়িত্ব ছেড়ে দেবেন, আগে থেকেই ঘোষণা দিয়ে রাখা ২০০৬ বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে ফাইনালে নিয়ে যাওয়া কোচ রেমন্ড ডমেনেখ তখনও জানেননা তার জন্য দক্ষিণ আফ্রিকায় কি অপেক্ষা করছে!
২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত হওয়া বিশ্বকাপে ফ্রান্সের সাথে একই গ্রুপ “এ” তে পড়ে স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা, দুইবাররে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে আর মেক্সিকো। বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি হবার সুবাদে কাগজে-কলমে ফ্রান্সের অনায়াসে পরের রাউন্ডে উঠে যাওয়ার কথা। কিন্তু আসল নাটক শুরু হল এখন থেকে।
গ্রুপপর্বে নিজেদের প্রথম ম্যাচে উরুগুয়ের সাথে গোলশূণ্য ড্র করে ফরাসীরা। আগের দিন অনুশীলনে চেলসি উইঙ্গার ফ্লোরেন্ত মালুদা’র সাথে কোচ ডমেনেখ বিবাদে জড়িয়ে পড়ায় উরুগুয়ের সাথে ম্যাচে মালুদাকে না খেলিয়ে উইঙ্গার হিসেবে সিডনি গোভুকে মাঠে নামান ডমেনেখ। মালুদার মত ফর্মে থাকা উইঙ্গারকে না খেলিয়ে গোভুর মত সাধারণ মানের উইঙ্গার খেলানোর সিদ্ধান্ত প্রচণ্ডরকম ব্যাকফায়ার করে ফ্রান্সকে – ম্যাচ ড্র করে তারা। মেক্সিকোর সাথে পরের ম্যাচেই মালুদাকে মূল একাদশে ফিরিয়ে আনেন ডমেনেখ, অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার ইয়োয়ান জুরকাফের জায়গায়। তাতেও বিশেষ কোন লাভ হয়না। ম্যাচের প্রথম ৪৫ মিনিটে মেক্সিকোর সাথে তাল মেলাতেই যেন কষ্ট হচ্ছিল ফ্রান্সের। কোচের বিরক্তিকর ট্যাকটিকসে বিরক্ত হয়ে দলের আরেক রগচটা সদস্য – দলের মূল স্ট্রাইকার নিকোলাস আনেলকা বিরতির সময় কোচকে গালিগালাজ করেন। যা ডমেনেখের আত্মসম্মানে লেগে যায়। দ্বিতীয়ার্ধে দুই গোল খেয়ে ম্যাচটা ২-০ গোলে হারে ফ্রান্স, ২০০৬ এর ফাইনালিস্টরা এবার একদম খাদের কিনারায় চলে আসে, গ্রুপপর্ব থেকে বিদায়ের শঙ্কা দেখা যায়।
তবে এতকিছুর পরেও ফরাসীরা দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠতে পারত। যদি গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকাকে উড়িয়ে দিয়ে একটা বড় জয় অর্জন করতে পারতো। ফ্রান্স দলের প্রতিভা ও দক্ষিণ আফ্রিকা দলের প্রতিভার তুলনামূলক বিচার করলে সেটা ফ্রান্সের জন্য একদমই অসম্ভব কিছু ছিল না। কিন্তু ঝামেলাটা লাগলো মাঠের বাইরে।
ফ্রান্স দলের খেলোয়াড়দের কাছে ডমেনেখ অনেক সম্মান পেতেন, অনেক ভালোবাসা পেতেন, এ কথা হয়তো ডমেনেখ নিজেও স্বীকার করবেন না। আনেলকার কাছে গালি খাওয়ার পরেও তিনি আনেলকাকে সুযোগ দিয়েছিলেন ক্ষমা প্রার্থনা করার। কিন্তু আনেলকা ক্ষমা প্রার্থনা না করায় ক্ষিপ্ত ডমেনেখ আনেলকাকে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেন, দল থেকে ছাঁটাই করেন। টুর্নামেন্টের মাঝখানে ফর্মে থাকা দলের মূল স্ট্রাইকারের এরকম বিদায় মেনে নিতে পারেনি আনেলকার সতীর্থরা। দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের তিনদিন আগে অনুশীলনে ফিটনেস কোচ রবার্ট ডুভার্নের সাথে হাতাহাতিতে লিপ্ত হন অধিনায়ক প্যাট্রিস এভরা। কারণ? কোচের অধীনে অনুশীলন বয়কট করার জন্য খেলোয়াড়দের স্বাক্ষরিত একটা চিঠি এনেছিলেন এভরা! ডমেনেখের অধীনে কেউই অনুশীলন করতে চান না তারা! এ যেন আরেক ফরাসী বিপ্লব!
এভরা আর ডুভার্নের সেই মারামারি!
সেদিন অনুশীলনে এভরা আর ডুভার্নকে আলাদা করেন এই ডমেনেখ। মিডিয়ার সামনে দলের সেই চিঠি পড়েও শোনাতে হয় সেই তাকেই। দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে ম্যাচের আগে দলের হতোদ্যম এই পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপ করেন ফরাসী প্রধানমন্ত্রী নিকোলা সারকোজি ও ক্রীড়ামন্ত্রী রোজেলিন ব্যাশেলোঁ, পুরো স্কোয়াডের সাথে মিটিং করেন ব্যাশেলোঁ – তাদেরকে অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাতেও কোন লাভ হয়না। তৃতীয় ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে অপ্রত্যাশিতভাবে ২-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপ যাত্রার সমাপ্তি টানে ফ্রান্স। পদত্যাগ করেন ফিটনেস কোচ রবার্ট ডুভার্ন, ফরাসী ফুটবল ফেডারেশনের প্রধান জ্যাঁ-পিয়েরে এস্ক্যালেত্তে ও টিম ডিরেক্টর জ্যাঁ-লুই ভ্যালেন্তিন। টুর্নামেন্টের পর দলকে অস্থিতিশীল করে তোলার মূল গোতা – অধিনায়ক প্যাট্রিস এভরা, মিডফিল্ডার জেরেমি তুলালান ও ফ্র্যাঙ্ক রিবেরি, স্ট্রাইকার নিকোলাস আনেলকাকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হয়। জাতীয় দল থেকে ১৮ মাসের জন্য নিষিদ্ধ হন আনেলকা। যথাক্রমে ৫, ৩ ও ১ ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ হন এভরা, রিবেরি ও তুলালান। পরে জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণাই দিয়ে দেন আনেলকা। ডমেনেখের জায়গায় ফরাসী দলের কোচ হিসেবে আসেন লরাঁ ব্লাঁ।
ফরাসী এই বিপ্লব নিঃসন্দেহে কোন থ্রিলার সিনেমার কাহিনীকেও হার মানিয়েছিল!

*এপ্রিল ৩০, ২০১৮ তারিখে গোল্লাছুট ডটকমে প্রকাশিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Post

Got a PROJECT

IN MIND?

©2024 Nishat Ahmed Zishan, All Rights Reserved.

Developed by Asif Mollik