আমিনুল হক : দেশীয় ফুটবলের ‘স্মাইকেল’

ছোটবেলায় খেলতেন মিরপুর পল্লবীর এক মাঠে। সেখানে বয়স কম বলে বড় ভাইয়েরা আক্রমণভাগে খেলতে দিত না তাঁকে। গোল করার ইচ্ছা সবারই ছিল, তাঁরও ছিল বৈকি। কিন্তু ঐ যে, বয়স কম, ছোট মানুষ। অগত্যা প্রত্যেকবার বড় ভাইদের গোল করার ইচ্ছা পূর্ণতা পেত তাঁর ত্যাগের বিনিময়ে। কে জানত, এই ত্যাগের ফলেই বাংলাদেশ একদিন পাবে তাদের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম ফুটবল খেলোয়াড়কে?

গোলরক্ষক আমিনুল হককে শ্রেষ্ঠ ফুটবলার বললে অনেকে নাক সিঁটকাতেও পারেন। কায়সার হামিদ, মোনেম মুন্না, কাজী সালাউদ্দিন, জাদুকর সামাদ বাংলাদেশে যুগজয়ী খেলোয়াড়দের কমতি ছিল না কখনই। কিন্তু তাও আমিনুল হককে কেন ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম খেলোয়াড় বলা?

এটা এই লেখকের না, খোদ বাংলাদেশ দলের সাবেক কোচ জর্জ কোটানের বক্তব্য। বাংলাদেশের একমাত্র সাফ ফুটবলের শিরোপা এসেছিল যে কোচের হাত ধরে। কোটান বলেছিলেন, তাঁর দেখা শ্রেষ্ঠতম গোলরক্ষক এই আমিনুল হক। বাংলাদেশের ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড় তো বটেই।

কথাটা কি খুব বেশী ভুল বলেছেন তিনি? আধুনিক দক্ষিণ এশীয় ফুটবলে ভারতের বাইচুং ভুটিয়া ও সুনীল ছেত্রি আর ওদিকে মালদ্বীপের আলি আশফাক ছাড়া আর কে প্রভাব রাখতে পেরেছেন আমিনুল হকের চেয়ে বেশী?

যা বলছিলাম, স্ট্রাইকার হতে চেয়েও স্ট্রাইকার হতে না পারা আমিনুল পরে বুঝলেন যে না, গোলরক্ষকের পজিশনটার প্রতিও বেশ আগ্রহ জন্মে গেছে তাঁর। সেই আগ্রহের আগুনে যেন সলতে দিলেন সাবেক ডেনমার্ক গোলরক্ষক পিটার স্মাইকেল। ১৯৯২ ইউরোতে আন্ডারডগ হিসেবে শিরোপা জেতে ডেনিশরা দুই লাউড্রপ (মাইকেল ও ব্রায়ান) ভাইদের পাশাপাশি যে দলের কান্ডারি ছিলেন পিটার স্মাইকেলও। পরে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মত ক্লাবে যোগ দিয়ে একের পর এক অত্যাশ্চর্য কীর্তি করা সেই স্মাইকেলই হয়ে গেলেন আমাদের আমিনুলের আইডল। আর বছর দশেকের মধ্যে সেই আমিনুলই হয়ে গেলেন আমাদের দেশীয় ফুটবলের স্মাইকেল’!

২০০৩ সাফ ফুটবলে তাঁর পারফরম্যান্সের কথা কি সহজে ভোলা যায়? এমনকি ২০০৫ সাফেও বলতে গেলে একাই দলকে ফাইনালে টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন, যদিও পরে বাইচুংয়ের ভারতের কাছে হারতে হয়। সোনায় মোড়ানো ২০০৩ সালটা আরেকটু রঙিন হয়ে গিয়েছিল মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়া সংসদের হয়ে লিগ জেতার কারণে, যে মুক্তিযোদ্ধাতেই আমিনুল কাটিয়েছেন তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা সময়গুলো। মোট পাঁচবার ফেডারেশন কাপ জেতা আমিনুল দুইবার জিতেছেন মুক্তিযোদ্ধার হয়ে, দুইবার মোহামেডানের হয়ে, আর বাকী একবার ব্রাদার্সের হয়ে। জাতীয় দলের হয়ে ১৯৯৮ সালে অভিষিক্ত আমিনুল দীর্ঘ বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের ইতি টানেন ২০১১ সালে।

আজকে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ দেখার জন্য প্রতি সপ্তাহে আমরা উন্মুখ হয়ে বসে থাকি। আর্সেনালের পিটার চেক, লিভারপুলের অ্যালিসন বেকার, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ডেভিড ডা হেয়া কত বিশ্ব মাতানো গোলরক্ষকই না খেলেন এইখানে! অথচ আরেকটু হলে এদের নামের পাশাপাশি উচ্চারিত হতে পারত আমাদের আমিনুলের নামও। শ্যে গিভেনের নাম মনে আছে? নির্ভরযোগ্য আইরিশ এক গোলরক্ষক, যিনি কিনা ক্যারিয়ারের একটা বিশাল অংশ নিউক্যাসল ইউনাইটেডের হয়ে খেলার পরে ম্যানচেস্টার সিটি, স্টোক সিটির মত ক্লাবেও খেলে গিয়েছেন? আরেকটু হলে এই শ্যে গিভেনের জায়গাতেই মাঠ মাতাতে পারতেন আমাদের আমিনুল, নিউক্যাসল ইউনাইটেডের হয়ে। তখন আমিনুলের বয়স ২০, মোটামুটি ২০০০ সালের কথা সেটা। নিউক্যাসলের কর্তাব্যক্তিরা চাইলেন দক্ষিণ এশিয়া সেরা গোলরক্ষক প্রতিভাটাকে নিজেদের করে নিতে। কিন্তু পারলেন না। পারলেন না আমাদের দেশের ফুটবল ফেডারেশনের গাফিলতির কারণেই। দলবদল বিষয়ক প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সময়মত ফিফার কাছে হস্তান্তর না করার কারণে আমিনুলের প্রিমিয়ার লিগ-স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে যায়। তাঁর নিজেরও বয়স কম ছিল, নিজেও তাই উদ্যোগী হয়ে ফিফার কাছে দলবদলের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করতে পারেননি। পরে একই কারণে সৌদির বিখ্যাত ক্লাব আল হিলালও তাকে দলে নিতে পারেনি। ভেবে দেখুন, আজকে আমিনুল ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলে দেশীয় ফুটবলারদের জন্য প্রিমিয়ার লিগে খেলার দরজাটা খুলে দিলে আজকে জামাল ভুঁইয়া, মামুনুল, ওয়ালী ফয়সাল, এমিলি, হেমন্তরা কোথায় থাকতেন?

১৯৮০ সালের আজকের এই দিনে জন্ম নেন কালজয়ী এই গোলরক্ষক। জন্মদিনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা, আমিনুল হক!

*২০১৮ সালের ৫ অক্টোবর গোল্লাছুট ডটকমে প্রকাশিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Post

Got a PROJECT

IN MIND?

©2024 Nishat Ahmed Zishan, All Rights Reserved.

Developed by Asif Mollik