নিকো কোভাচ : বায়ার্ন মিউনিখের নতুন কোচের ট্যাকটিকস ও অন্যান্য

বেশ কয়েকদিন ধরেই বায়ার্নের নতুন কোচ কে হবেন – এই নিয়ে কৌতুহল ছিল সবার মাঝে। বায়ার্নের ইতিহাসের অন্যতম সেরা কোচ ইয়াপ হেইঙ্কেস বায়ার্নের জন্য এখনো সবচেয়ে আদর্শ কোচ হলেও, ৭২ বছর বয়সী হেইঙ্কেসের নিজেরই ইচ্ছা নেই এই বয়সে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলের চাপ সামলানোর। খুবই আচমকা ছাঁটাই হওয়া ইতালিয়ান কোচ কার্লো অ্যানচেলত্তির বদলে ভারপ্রাপ্ত কোচ হিসেবে আসা হেইঙ্কেস আগে থেকেই জানিয়ে দিয়েছিলেন, এই মৌসুমের পর আর বায়ার্নের ডাগআউটে দেখা যাবেনা তাঁকে। নিজেদের ক্লাবের অন্যতম সফল এই কোচের উত্তরসূরি কাকে করা যায়, এই নিয়ে শোনা গিয়েছিল অনেক নাম। বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের সাবেক কোচ টমাস টুখেল, ফরাসী ক্লাব ওজিসি নিসের লুসিয়েন ফাভরে, হফেনহেইমের জুলিয়েন ন্যাগেলসম্যান – বায়ার্নের পরবর্তী কোচ হিসেবে নাম শোনা গিয়েছিল অনেকেরই। কিন্তু তাদেরকে বাদ দিয়ে সামনের মৌসুম থেকে তিন মৌসুমের জন্য আইনট্র্যাখট ফ্র্যাঙ্কফুর্টের ক্রোয়েশিয়ান ম্যানেজার নিকো কোভাচ কে ম্যানেজার হিসেবে নিয়ে আসলো বায়ার্ন মিউনিখ। জুলাই মাসের ১ তারিখ থেকে বায়ার্নের কোচ হিসেবে দায়িত্ব শুরু করবেন নিকো কোভাচ।
নিকো কোভাচ কে আইনট্র্যাখট ফ্র্যাঙ্কফুর্ট থেকে নিয়ে আসার জন্য ক্ষতিপূরণ বাবদ বায়ার্নকে ২.২ মিলিয়ন ইউরো দেওয়া লাগবে তাদের। নিকো কোভাচ এর সাথে বায়ার্নের সম্পর্ক কিন্তু এই প্রথম নয়। খেলোয়াড়ি জীবনে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে খেলা এই নিকো কোভাচ ২০০১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত দুই মৌসুম খেলে গিয়েছিলেন বায়ার্নে। বায়ার্নের হয়ে জিতেছেন জার্মান বুন্দেসলিগা ও লিগ কাপ। সেই থেকেই তাদের সাথে কোভাচের সুসম্পর্ক। বায়ার্নের বর্তমান স্পোর্টিং ডিরেক্টর হাসান সালিহামিদজিচের সাথেও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে তাঁর। কিন্তু নিকো কোভাচ কি আসলেই বায়ার্নের জয়যাত্রা অব্যাহত রাখতে পারবেন?
মার্চ ২০১৬ তে ফ্র্যাঙ্কফুর্টের দায়িত্ব নেওয়া নিকো কোভাচ সে মৌসুমে অবধারিত অবনমনের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন ফ্র্যাঙ্কফুর্টকে। পরের মৌসুমে ফ্র্যাঙ্কফুর্টকে জার্মান কাপের ফাইনাল পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। এবার ফ্র্যাঙ্কফুর্টের হয়ে নিকো কোভাচ এত ভালো করছেন, আরেকটু হলে সামনের মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগে ফ্র্যাঙ্কফুর্টকে দেখতে পাবো আমরা। চতুর্থ স্থানে থাকা বেয়ার লেভারক্যুজেনের চেয়ে মাত্র দুই পয়েন্ট পিছিয়ে তারা। কোনভাবে এই মৌসুম চতুর্থ অবস্থানে থেকে শেষ করতে পারলেই সামনের মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগ খেলবে ফ্র্যাঙ্কফুর্ট। ইতোমধ্যে এই মৌসুমের জার্মান কাপ সেমিফাইনালেও উঠে গেছে তারা, সামনের সপ্তাহে লড়বে শালকে ০৪ এর বিপক্ষে। ফ্র্যাঙ্কফুর্টের আগে নিকো কোভাচ জাতীয় দল ক্রোয়েশিয়ারও দায়িত্ব সামলেছেন, দলকে নিয়ে গিয়েছিলেন ২০১৪ বিশ্বকাপ ও ২০১৬ ইউরোতেও।
অনেক কম বাজেটের দল হওয়া সত্ত্বেও ফ্র্যাঙ্কফুর্টকে নিয়ে একের পর এক চমক দেখিয়ে যাচ্ছেন নিকো কোভাচ। নিকো কোভাচ খুব ভালো করেই জানেন, ফ্র্যাঙ্কফুর্ট বায়ার্ন মিউনিখের মত বড় কোন দল নয়। তাই তাকে কম বাজেটে সীমিত সুযোগের মধ্যে থেকেই চমক দেখাতে হবে। হতে হবে ট্যাকটিকসের দিক দিয়ে একদম পারফেক্ট। ঠিক এটাই করে যাচ্ছেন তিনি ফ্র্যাঙ্কফুর্টে এসে। ফ্র্যাঙ্কফুর্টকে ৩-১-৪-২ বা ৩-৪-১-২ ফর্মেশানে খেলানো এই কোচ বায়ার্নের মত অত বল পজেশন ভিত্তিক ফুটবল খেলানোর মত সৌখিন নন, এরকম সৌখিনতা ফ্র্যাঙ্কফুর্টের মত ক্লাবগুলো দেখাতে পারেনা। তাই তাঁর স্টাইল একদম ভিন্ন, অনেকটা সরাসরি বা ডিরেক্ট। বল যখন ফ্র্যাঙ্কফুর্টের কাছে থাকেনা, তখন মাঝের তিনজন মিডফিল্ডার সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে একদম একসাথে থাকে, জটলা বেঁধে (৩-৪-১-২ ফর্মেশানে একজন সেন্ট্রাল অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার আর দুইজন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার, আর ৩-১-৪-২ ফর্মেশানে একজন সেন্ট্রাল ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার আর দুজন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার)। দলের উইংব্যাকগুলো তখন একেবারে নিচে নেমে আসে, তিনজন সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারকে মাঝে রেখে। সেন্ট্রাল ডিফেন্ডাররা তখন সামনে চলে এসে প্রতিপক্ষ স্ট্রাইকারদের জন্য অফসাইড ট্র্যাপের সৃষ্টি করেন, ফলে প্রতিপক্ষের আক্রমণ নস্যাৎ হয়ে যায়।
আইনট্র্যাখট ফ্র্যাঙ্কফুর্টের ট্যাকটিকস
নিজেদের পায়ে বল আসার পর একদম সঠিক সুযোগ না আসা পর্যন্ত ফ্র্যাঙ্কফুর্ট আক্রমণে যায়না। বল পাওয়ার সাথে সাথে দুইজন উইংব্যাক উপরে উঠে যায়, তিনজন সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার গোলরক্ষকের সামনে ছড়িয়ে অবস্থান নেন। একজন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার তখন সেন্ট্রাল মিডফিল্ড ও সেন্ট্রাল ডিফেন্সের মাঝখানের জায়গাটার মধ্যে অবস্থান করেন যাতে জায়গাটা ফাঁকা না থাকে, ও প্রতিপক্ষ যাতে কাউন্টারে সেই জায়গাটার সদ্ব্যবহার না করতে পারে। একজন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার তখন আস্তে আস্তে সামনে উঠে গিয়ে দুই স্ট্রাইকারের পিছে অবস্থান নেন, যাতে ডিফেন্স থেকে স্ট্রাইকারদের কাছে লং বল চলে গেলে সেই মিডফিল্ডার ফ্র্যাঙ্কফুর্টের দুই স্ট্রাইকারকে সহায়তা করতে পারেন। নিকো কোভাচ এর আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ স্টাইল হল ফ্র্যাঙ্কফুর্টের খেলোয়াড়দের দিয়ে কার্যকরী প্রেস করানো। প্রতিপক্ষের গোল কিকের সময় ফ্র্যাঙ্কফুর্টের সামনের তিনজন খেলোয়াড় ক্রমাগত প্রেস করতে থাকেন যতক্ষণ না পর্যন্ত প্রতিপক্ষ বল আকাশে উড়িয়ে সামনে না পাঠাচ্ছেন, সে ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে হাই-লাইন ডিফেন্সে থাকা তিনজন সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার অনায়াসেই আকাশে থাকা বলের পজেশান নিজেদের মধ্যে নিয়ে নিয়ে আক্রমণের সূচনা করেন। নিকো কোভাচ এর এই ট্যাকটিকসের জন্যই ফ্র্যাঙ্কফুর্ট এই মৌসুমে এত সফল। কোভাচ কি পারবেন তাঁর এই সাফল্যের পুনরাবৃত্তি বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে করতে? দেখা যাক!

*এপ্রিল ১৩, ২০১৮ তারিখে গোল্লাছুট ডটকমে প্রকাশিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Post

Got a PROJECT

IN MIND?

©2024 Nishat Ahmed Zishan, All Rights Reserved.

Developed by Asif Mollik