পেনাল্টি মিস আর মাদকের কাছে মূল্য চুকানোর বিশ্বকাপ

পূর্বাভাস দেওয়া বুঝি একেই বলে।

পেনাল্টি মিসের দুটি ছবি। এক ছবি দিয়েছিল ১৯৯৪ বিশ্বকাপ শুরুর বার্তা, আরেক ছবি দিয়ে পর্দা নেমেছিল টুর্নামেন্টের। মাহাত্ম্য, গুরুত্ব, প্রভাবের দিক দিয়ে দুই পেনাল্টি মিসের তুলনা চলে না কোনোভাবেই। প্রথম মিসটা দ্বিতীয়টার চেয়ে যোজন যোজন পিছিয়ে। প্রথম পেনাল্টিটা আলংকারিক, আনুষ্ঠানিক। দ্বিতীয়টা একজন ফুটবলারের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিরোপা নির্ধারণের ঠিক আগ মুহূর্তের। প্রথমটা মিস করা ব্যক্তিকে হতাশার গ্লানি বয়ে বেড়াতে হয়নি আজীবন। পরের মিস যিনি করেছেন, তাঁর কপালে অবশ্য সে সুখটুকু জোটেনি। এখনও বয়ে বেড়াচ্ছেন সেই মিসের অনন্ত আক্ষেপ।

প্রথমজন ডায়ানা রস। দ্বিতীয়জন রবের্তো ব্যাজ্জো। প্রথমজনকে না চিনলেও সমস্যা নেই, আপনাকে কেউ শূলে চড়াবে না। দ্বিতীয়জনকে ফুটবলপ্রেমী-মাত্রই চিনবেন। ফুটবল মাঠে যার নৈপুণ্যকে প্রায়ই ছাপিয়ে যায় ওই পেনাল্টি মিসের হতাশা। ১৯৯৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে পেনাল্টি শুটআউটে ব্যাজ্জোর ওই মিসই নিশ্চিত করেছিল, দুই যুগ পর বিশ্বজয়ের বরমাল্য শোভা পাচ্ছে ব্রাজিলিয়ানদের গলায়। আর ক’মাস আগেই বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়ের তকমা পাওয়া ব্যাজ্জোর ইতালিকে ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে।

ডায়ানা রসের পেনাল্টির ওপর অবশ্য ব্যাজ্জোর মতো জাতিগত স্বপ্নের বাঁচা-মরা নির্ভর করছিল না। পেনাল্টিটা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের ওই গায়িকার পারফরম্যান্সের শোভাই বাড়িয়েছিল শুধু। কথা ছিল, গান গাইতে গাইতে বলে লাথি মারবেন ডায়ানা, পোস্টের সামনে গোলকিপার থাকলেও বল আটকানো হবে না। বল জড়াবে জালে, আর সঙ্গে সঙ্গে দুভাগ হয়ে যাবে গোটা গোলপোস্ট। ডায়ানা সে পেনাল্টি মেরেছিলেন অনেক অনেক বাইরে। তাতে কী? গোলপোস্ট ভাগ ঠিকই হয়েছিল। তা দেখে হেসে কুটি কুটি বিশ্বের তাবৎ ফুটবলপ্রেমী। যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়ার খবর শুনে ইউরোপের এক নামকরা সাংবাদিক বলেছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ আয়োজন করা আর আফ্রিকায় বরফ স্কি আয়োজন করার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই’। ডায়ানার মিস দেখে তিনিও ওই হেসে খুন হওয়াদের দলেই ছিলেন হয়তো! মিস করা নিয়ে ডায়ানার কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিল না, নেচে-গেয়ে পরিকল্পনামাফিক পারফরম্যান্স শেষ করেছিলেন তিনি। ব্যাজ্জোর অবশ্য পেনাল্টি মিস করার ঘটনাটা ওভাবে ভুলে নাচ-গানে ডুবে যাওয়া সম্ভব ছিল না!

তা যা-ই হোক, টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী দিনে ডায়ানা রসের পেনাল্টি মিস দেখে কে ভেবেছিল, শেষটাও অমন এক মিস দিয়েই হবে? সকাল দিনের সঠিক পূর্বাভাস দেয় – ফুটবলের সঙ্গে প্রবাদবাক্যের সমন্বয় সব সময় না হলেও, ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ঠিকই হয়েছিল। বিশ্বজয়ের স্বপ্ন বিকিয়ে যে সমন্বয়ের মূল্য চুকিয়েছিলেন ব্যাজ্জো।

ব্যাজ্জো অবশ্য নিজেকে ভাগ্যবান ভাবতে পারেন, শুধু স্বপ্ন বিকিয়েই মূল্য চুকাতে হয়েছে তাঁকে। জীবন দিতে হয়নি অন্তত। এখনও বেঁচেবর্তে আছেন। আন্দ্রেয়া এসকোবারের অবশ্য সেই সৌভাগ্য হয়নি। কলম্বিয়ার এই ডিফেন্ডারের আত্মঘাতী গোলে দ্বিতীয় রাউন্ডের টিকিট পেয়েছিল স্বাগতিকেরা। নিজের খেলোয়াড়ের দোষে বিশ্বকাপ স্বপ্ন ধ্বংস হওয়ার ব্যাপারটা হজম করতে পারেননি সান্তিয়াগো গ্যাশন, কলম্বিয়া দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠবে ভেবে বিশাল অঙ্কের বাজি ধরেছিলেন যিনি। দেহরক্ষী উমবের্তো কাস্ত্রো মুনিয়োজকে দিয়ে হত্যা করেছিলেন এসকোবারকে। নিজ দেশের শহর মেদেজিনের এক পানশালায় সারা রাত কাটানোর পর বের হওয়াটাই কাল হয়েছিল এসকোবারের। পানশালার বাইরে থাকা মুনিয়োজের পয়েন্ট থ্রি-এইট ক্যালিবারের পিস্তল থেকে বের হয়ে আসা ছয়-ছয়টা গুলি ঝাঁঝরা করে দেয় এসকোবারের শরীর। প্রত্যেকটা গুলির পর ধারাভাষ্যকারদের নকল করে ‘গোল’, ‘গোল’ চিৎকার করছিলেন কাস্ত্রো, ফলে কারোর বুঝতে বাকি ছিল না, কেন প্রাণ দিয়েছেন এসকোবার। কী নির্মম, কী নিষ্ঠুর!

চুরানব্বইয়ে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল আরও একজনের। ব্যাজ্জো আর এসকোবারের স্বপ্নভঙ্গের পেছনে তাঁদের হাত না থাকলেও, তৃতীয় এই ব্যক্তির ব্যাপারে অবশ্য সেটা বলা যায় না। তিনি আর কেউ নন, ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা। প্রথম রাউন্ডে গ্রিসের বিপক্ষে গোল করে ক্যামেরার সামনে অপ্রকৃতিস্থের মতো বুনো উল্লাসে মেতেছিলেন। দেশের জন্য ম্যারাডোনার আবেগ নিয়ে প্রশ্ন তোলা বাতুলতা, তাও, সে উদযাপনে আবেগের চেয়েও বেশি অনেক কিছুই ছিল। ছিল ভীতিজাগানিয়া অপার্থিব একটা ব্যাপার। সবাই সন্দেহ করা শুরু করলেন, কোকেন নেওয়ার জন্য বিখ্যাত তারকাটি নিশ্চয়ই এবারও অমন নিষিদ্ধ কোনো কাজ করেছেন, আশ্রয় নিয়েছেন মাদকের। না হয় ওই চোখ জোড়ায় এত আগুন তো থাকার কথা নয়! ডোপ টেস্টের ফলাফল সে সংশয়কে বৈধতা দিয়েছিল। ৯০-এ হাতছোঁয়া দূরত্বে রেখে আসা ট্রফিটাকে আবারও ছোঁয়ার আশায় যুক্তরাষ্ট্রে পা রাখা ম্যারাডোনার বিদায়টাও হয় নতমুখে, নিজের দোষে। ম্যারাডোনাহীন আর্জেন্টিনাও হারিয়ে ফেলে অনুপ্রেরণা, দ্বিতীয় রাউন্ডে ‘কার্পাথিয়ান ম্যারাডোনা’ হিসেবে খ্যাত ঘিওর্ঘি হ্যাগির রোমানিয়ার কাছে হেরে বিদায় নেয় আসল ম্যারাডোনার দল।

দেশকে তৃতীয় বিশ্বকাপ এনে না দিতে পারার কষ্টের সঙ্গে যুক্ত হয় বিশ্বকাপ থেকে নিজের দোষেই গলাধাক্কা খাওয়ার গ্লানি। ঘরে বসে আবার দেখতে হয় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলের বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দ। ম্যারাডোনার কষ্টটা শেষমেশ ব্যাজ্জোর চেয়ে তেমন কম ছিল না, বলাই যায়!

*২০২২ বিশ্বকাপের আগে দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Post

Got a PROJECT

IN MIND?

©2024 Nishat Ahmed Zishan, All Rights Reserved.

Developed by Asif Mollik