যত কাণ্ড বিশ্বকাপ ফুটবলে : লাল-হলুদ কার্ডের প্রচলন ঘটায় যে ম্যাচ

আর মাত্র ৫০ দিন বাকী। ৫০ দিন পরেই শুরু হবে বিশ্ব ফুটবলের সর্ববৃহৎ মহাযজ্ঞ – বিশ্বকাপ ফুটবল। ১৯৩০ সাল থেকে শুরু হওয়া এই মহাযজ্ঞের একবিংশতম আসর বসছে এইবার – রাশিয়ায়। বিশ্বকাপ ফুটবলের অবিস্মরণীয় কিছু ক্ষণ, ঘটনা, মুহূর্তগুলো আবারও এই রাশিয়া বিশ্বকাপের মাহেন্দ্রক্ষণে পাঠকদের মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য গোল্লাছুট ডটকমের বিশেষ আয়োজন “যত কাণ্ড বিশ্বকাপ ফুটবলে”!
প্রথমে আজকে শুরু করব ১৯৬২ সালে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের কাহিনী দিয়ে। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ চিলিতে অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল ১৬টি দেশ। চার গ্রুপে ভাগ হয়ে খেলা ১৬ দলের বিশ্বকাপ এর গ্রুপ বি তে ছিল স্বাগতিক চিলি, ইতালি, পশ্চিম জার্মানি আর সুইজারল্যান্ড। নিজেদের গ্রুপপর্বের দ্বিতীয় ম্যাচে চিলি আর ইতালির মোকাবিলা করার কথা। কিন্তু তার আগেই তৎকালীন দুইবারের বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন ইতালি আর তার সাংবাদিকেরা একটা নোংরা খেলায় মেতে উঠেছিল।
আর এই খেলার মূল হোতা ছিলেন দুই ইতালিয়ান সাংবাদিক আন্তোনিও ঘিরেল্লি আর করাদো পিজিনেল্লি। ঘিরেল্লি তখন লিখতেন “করিয়েরে দেল্লা সেরা”র হয়ে, যে পত্রিকাকে মোটামুটি ইতালির “নিউ ইয়র্ক টাইমস” ভাবা হয়। আর ওদিকে পিজিনেল্লি লিখতেন ফ্লোরেন্সের “লা নাজিওনালে” পত্রিকার হয়ে। দুই সাংবাদিকই বিশ্বকাপ শুরুর আগে বলতে গেলে স্ব স্ব পত্রিকায় স্বাগতিক চিলিকে ধুয়ে দিলেন। পিজিনেল্লি লিখলেন – চিলি একটা অশিক্ষিত, মূর্খ, অপুষ্টিতে ভোগা দরিদ্র একটা দেশ। জঘন্য একটা পিছিয়ে পড়া দেশ যার জনগোষ্ঠীর কাজই হল মদ খাওয়া, আর দেশটা সম্পূর্ণরূপে একটা পতিতালয়। ওদিকে ঘিরেল্লি লিখলেন, ১৯৬০ সালে ইতিহাসের ভয়ংকরতম ভূমিকম্পের শিকার হওয়া চিলি কিভাবে ১৯৬২ সালে বিশ্বকাপ আয়োজন করতে পারছে সেটা তিনি ভেবে পান না। তাদের বিশ্বকাপ আয়োজন করতে চাওয়া আর বেনিতো মুসোলিনির লণ্ডনে বিমানবাহিনী পাঠিয়ে বোমা ফেলা একই (মুসোলিনি লণ্ডনে বিমানবাহিনী পাঠিয়ে বোমা ফেলেননি)। পশ্চাৎপদ এক দেশ চিলি, যাদের ফোন কাজ করেনা, পুরো দেশের মধ্যে ৭০০টা হোটেলের বিছানা আছে। আর সেখানে ট্যাক্সি পাওয়া আর বিশ্বাসী স্বামী পাওয়া একইরকম কঠিন।
এই দুই সাংবাদিকের লিখালিখির ফলাফল হল ভয়ংকর। ক্ষেপে উঠলেন চিলির সাংবাদিকেরাও। একনায়ক মুসোলিনির ইতিহাস, ইতালি ফুটবলের ক্রমাগত ম্যাচ পাতানো আর ডোপিং কেলেঙ্কারির দিকে আঙ্গুল উঠিয়ে তারাও ইতালিকে আখ্যায়িত করলো একটা মাফিয়া, ফ্যাসিস্ট আর ড্রাগে আসক্ত দেশ হিসেবে। চিলির মানুষজন ইতালির মানুষের উপর এতটাই ক্ষিপ্ত ছিল যে রাজধানী সান্তিয়াগোর একটা বারে একটা আর্জেন্টাইন মানুষকে ইতালিয়ান ভেবে বেধড়ক পেটায় তারা। ফলে ১৯৬২ এর বিশ্বকাপে এই দুই দেশের মধ্যেকার ম্যাচটা যে সহজ কিছু হবেনা, সেটা মোটামুটি সবারই বোঝা হয়ে গিয়েছিল। ইতালিয়ানরা ফিফা কে অনুরোধ করে স্প্যানিশ রেফারির জায়গায় ম্যাচটা যাতে একজন ইংলিশ রেফারি পরিচালনা করেন তাঁর জন্য। ম্যাচ শুরু হবার সাথে সাথেই দর্শকদের বুঝতে বাকী থাকেনা তারা কি জঘন্য একটা ম্যাচ দেখতে যাচ্ছে।

এই দুই দল মঞ্চস্থ করলো বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম ন্যাক্কারজনক আর মারামারিপূর্ণ এক ম্যাচ। ম্যাচের ১২ সেকেন্ডেই প্রথম ফাউল দেখে এই ম্যাচ। ম্যাচের ১২ মিনিটে চিলির হনোরিনো ল্যান্ডাকে ফাউল করার দায়ে ইংলিশ রেফারি কেন অ্যাস্টন ইতালিয়ান মিডফিল্ডার জর্জিও ফেরিনিকে মাঠ থেকে বের করে দেন। কিন্তু রেফারির কথা না শুনে ফেরিনি মাঠ থেকে বের হতে না চাইলে পরে পুলিশ এসে তাঁকে মাঠ থেকে বের করে নিয়ে যায়। এরপর চিলিয়ান লেফট উইঙ্গার ইতালিয়ান ডিফেন্ডার মারিও ডেভিডকে একটা ঘুষি মারেন, যা রেফারি কেন অ্যাস্টনের চোখ এড়িয়ে যায়, পরে প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে মারিও ডেভিড স্যানচেজের মাথায় একটা লাথি মারার চেষ্টা করেন, যেটা দেখে ফেলেন কেন অ্যাস্টন – আর তা দেখে ডেভিডকে মাঠ থেকে বের করে দেন।
ইতালির আর্জেন্টাইন-বংশোদ্ভুত স্ট্রাইকার হামবার্তো মাশ্চিওকে “প্রতারক” বলে ঘুষি মেরে নাক ফাটিয়ে দেন এই স্যানচেজই, কিন্তু সেটাও অ্যাস্টনের চোখ এড়িয়ে যায়। পুরো ম্যাচে ফুটবল খেলাটা কোন দলেরই মূল লক্ষ্য ছিল না, মূল লক্ষ্য ছিল কিভাবে প্রতিপক্ষকে আঘাত করা যায় সেটা। পুরো ম্যাচে তিনবার পুলিশকে মাঠে এসে পরিস্থিতি শান্ত করতে হয়েছিল। পরবর্তীতে ইংলিশ রেফারি কেন অ্যাস্টন এই ম্যাচটা সম্পর্কে বলেছিলেন, “আমি সেদিন কোন ফুটবল ম্যাচ পরিচালনা করিনি, আমি সেদিন একটা মিলিটারি যুদ্ধের আম্পয়ার হিসেবে কাজ করছিলাম”। এই ম্যাচের বীভৎসতা থেকে শিক্ষা নিয়েই এই কেন অ্যাস্টনই প্রচলন করেন হলুদ কার্ড ও লাল কার্ডের ; মাঠের মধ্যে একবার কোন খেলোয়াড় অগ্রহণযোগ্য কোন আচরণ করলে হলুদ কার্ড দেখিয়ে সতর্ক করা হবে, পরে আবারও ওরকম কিছু করলে লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করে দেওয়া হবে।
বিবিসি’র সাংবাদিক ডেভিড কোলম্যানের মতে এই ম্যাচটা ছিল ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক ম্যাচ, ফুটবলের সবচাইতে জঘন্যতম প্রদর্শনী হয়েছিল এই ম্যাচেই!

*এপ্রিল ৩০, ২০১৮ তারিখে গোল্লাছুট ডটকমে প্রকাশিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Post

Got a PROJECT

IN MIND?

©2024 Nishat Ahmed Zishan, All Rights Reserved.

Developed by Asif Mollik