আর মাত্র ২৯ দিন বাকী। ২৯ দিন পরেই শুরু হবে বিশ্ব ফুটবলের সর্ববৃহৎ মহাযজ্ঞ – বিশ্বকাপ ফুটবল। ১৯৩০ সাল থেকে শুরু হওয়া এই মহাযজ্ঞের একবিংশতম আসর বসছে এইবার – রাশিয়ায়। বিশ্বকাপ ফুটবলের অবিস্মরণীয় কিছু ক্ষণ, ঘটনা, মুহূর্তগুলো আবারও এই রাশিয়া বিশ্বকাপের মাহেন্দ্রক্ষণে পাঠকদের মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য গোল্লাছুট ডটকমের বিশেষ আয়োজন “যত কাণ্ড বিশ্বকাপ ফুটবলে”!
এসসে বাহারমাস্ত। পুরো নাম এসফানদিয়ার বাহারমাস্ত। নামটা কি চেনা চেনা ঠেকছে? না। চেনা মনে হবার কথা নয়। ইরানিয়ান বংশোদ্ভুত এই আমেরিকান রেফারি এমন কেউ নন যে তাঁকে এক বলাতেই চিনতে হবে। কিন্তু এই এসসে বাহারমাস্তই বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা রেফারিং সিদ্ধান্তের জনক ছিলেন – জানেন কি সেটা?
১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র রেফারি হিসেবে বিশ্বকাপ পরিচালনা করতে গেলেন বাহারমাস্ত। স্বাভাবিকভাবেই, অত্যন্ত গর্বের একটা বিষয়, রেফারিদের মধ্যে একমাত্র তিনিই বিশ্বকাপ এ নিজের দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন, এ কি চাট্টিখানি কথা? গ্রুপ পর্বে দুটো ম্যাচের দায়িত্ব দেওয়া হল বাহারমাস্তকে – স্পেইন বনাম নাইজেরিয়া ও ব্রাজিল বনাম নরওয়ে। ব্রাজিল আর নরওয়ে সে বিশ্বকাপে গ্রুপ ‘এ’ তে ছিল, গ্রুপের বাকী দুই দল ছিল মরক্কো আর স্কটল্যান্ড। গ্রুপপর্বের শেষ রাউন্ডে মুখোমুখি হয়েছিল ব্রাজিল-নরওয়ে আর মরক্কো-স্কটল্যান্ড। স্কটল্যান্ড আর মরক্কোর সাথে জিতে ব্রাজিল এর মধ্যেই দ্বিতীয় রাউন্ডে অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে, তাই শেষ ম্যাচে যাই ফল হোক না কেন, ব্রাজিলের মাথাব্যথার কোন কারণ ছিল না। মাথাব্যথা ছিল গ্রুপের বাকী তিন দলের। বিশেষত মরক্কোর। শেষ রাউন্ডে স্কটল্যান্ডকে ৩-০ গোলে বিধ্বস্ত করে তিন পয়েন্ট পেয়ে নিজেদের মোট পয়েন্ট ৪ এ নিয়ে আসা মরক্কো খুব করে চাচ্ছিল আগের দুই ম্যাচে দুই ড্রয়ে দুই পয়েন্ট পাওয়া নরওয়ে শেষ ম্যাচে যেন কোনভাবেই জিততে না পারে। কেননা জিতলে নরওয়ের পয়েন্ট হয়ে যাবে ৫, তখন ব্রাজিলের সাথে দ্বিতীয় রাউন্ডে নরওয়েই চলে যাবে। নরওয়ে জিতলে বিষয়টা আশ্চর্যজনকও হত বেশ, কেননা ব্রাজিল তখনকার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, আর এর মধ্যেই নিজেদের অবস্থান দ্বিতীয় রাউন্ডে বিশ্চিত করেছে, তাই পরাক্রমশালী ব্রাজিলকে নরওয়ে হারাতে পারবে এটা বোধহয় নরওয়ের পাঁড় ভক্তরাও কল্পনা করতে পারেননি।
তো যাই হোক, ম্যাচ শুরু হল। ৭৮ মিনিট পর্যন্ত কোন দলই কোন গোল করতে পারলো না। পরে ৭৮ মিনিটে দুর্দান্ত হেডে গোল করে ব্রাজিলকে এগিয়ে দিলেন স্ট্রাইকার বেবেতো। এর পরেই যেন আড়মোড়া ভাংলো নরওয়ের। সে সময়ে চেলসিতে খেলা স্ট্রাইকার তোরে আন্দ্রে ফ্লো দুর্দান্ত ডানপায়ের এক প্লেসমেন্টে গোল করে সমতায় ফেরালেন নরওয়েকে। পুরো মরক্কোবাসী আর নরওয়েবাসী তখন ঈশ্বরকে ধরছে। আর একটা গোল যদি নরওয়ে করতে পারে, তাহলে মরক্কো বাদ পড়ে যাবে যে! তাই মরক্কো চাচ্ছিল ম্যাচটা যেন ড্র-ই হয়।
কিন্তু না, ফুটবল বিধাতা মরোক্কানদের কথায় কান দিলেন না। ৮৮ মিনিটে রেফারি এসসে বাহারমাস্ত হঠাৎ স্ট্রাইকার তোরে আন্দ্রে ফ্লো কে পেনাল্টি বক্সে পড়ে যেতে দেখে পেনাল্টির হুইসেল বাজালেন! ৮৯ মিনিটে কেতিল রেকদাল পেনাল্টিতে গোল করে ম্যাচটা ছিনিয়ে আনলেন ব্রাজিলিয়ানদের কাছ থেকে। মরক্কো নয়, দ্বিতীয় রাউন্ডে ব্রাজিলের সাথে উঠলো ঐ নরওয়েই।
ক্যামেরায় যা দেখানো হয়েছিল
এবার শুরু হল আসল কাহিনী। মাঠের মধ্যে ও বাইরে থাকা ১৬ টা ক্যামেরার কেউই ধরতে পারলো না পেনাল্টিটা কিভাবে হয়। প্রত্যেকটা ক্যামেরা এমন কোণে সেট করা ছিল, যে দেখে মনে হচ্ছিল ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডার জুনিয়র বাইয়ানো আর তোরে আন্দ্রে ফ্লো বাম দিক থেকে ধেয়ে আসা ক্রসটা সামলানোর জন্য একসাথে লাফাতে গিয়ে একজন আরেকজনের সাথে ধাক্কা লাগান, ফলে পড়ে যান ফ্লো। তাঁর উপর ধাক্কা লাগার সাথে সাথেই নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করে দু’হাত প্রসারিত করেন বাইয়ানো, ফলে টিভি সেটে সবাই মনে করে আসলে দুইজনের মধ্যে ধাক্কাই লেগেছে যেখানে জুনিয়র বাইয়ানোর কোন দোষই নেই।
আসলে যা হয়েছিল
ব্যস, শুরু হল বাহারমাস্তের মস্তক কাটা। ফ্রান্স, মরক্কো, ব্রাজিল, এমনকি আমেরিকার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বাহারমাস্তকে দোষী করে একের পর এক নিউজ ছাপাতে লাগলো। বাহারমাস্তকে ঠগ, জোচ্চর, অকর্মণ্য, শত্রু – কিছুই বলতে বাকী রাখলো না বিশেষত মরক্কোর সংবাদমাধ্যম। এদিকে বাহারমাস্ত নিজে নিজের সিদ্ধান্তে অটল, কেননা তিনি জানেন পেনাল্টি বক্সের মধ্যে জুনিয়র বাইয়ানো যে তোরে আন্দ্রে ফ্লো এর জার্সি ধরে টেনেছিলেন! আর পেনাল্টি বক্সের মধ্যে জার্সি ধরে টানার একটাই ফল হয় – পেনাল্টি।
দেড় দিন দুঃস্বপ্নের মধ্যে থাকার পর অবশেষে বাহারমাস্তের স্ত্রী’র চোখ পড়লো সুইডিশ এক পত্রিকার একটা নিউজে, যেখানে সম্পূর্ণ অন্য এক কোণ থেকে তোলা ছবি দিয়ে প্রমাণ করা হয়েছে পেনাল্টিটা আসলেই সঠিক ছিল, বাহারমাস্ত নির্দোষ!
ব্যস, এবার শুরু হল ক্ষমা চাওয়ার বন্যা। এই ৩৬ ঘন্টায় যারা যারা বাহারমাস্তকে গালি দিচ্ছিলেন সকলেই একবাক্যে মেনে নিলেন যে না, বাহারমাস্তই সঠিক ছিলেন! এমনকি এই রেফারিং সিদ্ধান্তটাকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা সিদ্ধান্ত হিসেবে মানা হয় এখন।
বাহারমাস্তের নিজের কি বক্তব্য এই ব্যাপারে?
“আমার কাছে, আমার ঈশ্বরের কাছে, এটা অবশ্যই পেনাল্টি। আমার সামনে ঠিক একই ঘটনা আরও ১০০ বার ঘটলে আমি ১০০ বারই পেনাল্টি দিতাম। কেননা আমি তখন সেই কোণে দাঁড়িয়ে ছিলাম যে কোণে বিশ্বের আর অন্য কোন ক্যামেরাই ছিল না। আমি দেখেছি কিভাবে জুনিয়র বাইয়ানো তোরে আন্দ্রে ফ্লো এর জার্সি টেনে তাঁকে ফেলে দিয়েছিল। মজার ব্যাপার হল, ঘটনার পর জুনিয়র বাইয়ানো নিজে কিন্তু এসে একবারও নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা করেনি, ও নিজে তাড়াতাড়ি এই জায়গা থেকে সরে দূরে চলে গিয়েছিল, ওর বাকী ব্রাজিল সতীর্থরাই আমার সাথে ঝগড়া করছিল।”