যত কাণ্ড বিশ্বকাপ ফুটবলে : মারাকানা নিস্তব্ধ হয়েছিল যার নেতৃত্বে

আর মাত্র ৪৪ দিন বাকী। ৪৪ দিন পরেই শুরু হবে বিশ্ব ফুটবলের সর্ববৃহৎ মহাযজ্ঞ – বিশ্বকাপ ফুটবল। ১৯৩০ সাল থেকে শুরু হওয়া এই মহাযজ্ঞের একবিংশতম আসর বসছে এইবার – রাশিয়ায়। বিশ্বকাপ ফুটবলের অবিস্মরণীয় কিছু ক্ষণ, ঘটনা, মুহূর্তগুলো আবারও এই রাশিয়া বিশ্বকাপের মাহেন্দ্রক্ষণে পাঠকদের মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য গোল্লাছুট ডটকমের বিশেষ আয়োজন “যত কাণ্ড বিশ্বকাপ ফুটবলে”!
আজকের কাহিনী সেই ১৯৫০ বিশ্বকাপের। ফুটবলের আঁতুড়ঘর ব্রাজিলে তখন বিশ্বকাপের দামামা বাজছে। রাউন্ড রবিন পদ্ধতিতে হওয়া সে টুর্নামেন্টে দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ব্রাজিল একের পর এক ম্যাচ জিতে উঠলো ফাইনালে। আগের ম্যাচগুলোতে সুইডেন ও স্পেইনকে গোলবন্যায় ভাসানো ব্রাজিল ফাইনাল ম্যাচটাকেও শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতার মোড়কেই খেলবে, এই আশা নিয়েই দুই লক্ষ ব্রাজিলবাসী জড় হয়েছিল ব্রাজিলের অবশ্যম্ভাবী জয়ের সাক্ষী হতে।
ফুটবল-দেবতা আড়াল থেকে মুচকি হেসেছিলেন বুঝি সেদিন।
রাউন্ড রবিন পদ্ধতিতে হবার ফলে ফাইনাল ম্যাচ হবার আগেই পয়েন্ট তালিকায় এক পয়েন্ট এগিয়ে ছিল ব্রাজিল। অর্থাৎ বিশ্বকাপ জেতার জন্য ব্রাজিলের ম্যাচটা জেতারও দরকার নেই, ড্র হলেই চলবে, কিন্তু পয়েন্ট তালিকায় ব্রাজিলের থেকে এক পয়েন্ট কম থাকার কারণে বিশ্বকাপ জিততে হলে সে ম্যাচটা জিততেই হবে উরুগুয়েকে।
এ ম্যাচও জিততে পারেনি ব্রাজিল। পারেনি ড্র করতেও। মারাকানার দুই লক্ষ মানুষকে সেদিন নিস্তব্ধ করে কাপ জিতে নিয়েছিল উরুগুয়ে। কিভাবে হয়েছিল সেই অসাধ্য সাধন?
হয়েছিল এক অকুতোভয়ী অধিনায়কের কারণে। আজকে একশ জন ফুটবলভক্তকে যদি জিজ্ঞেস করেন, ফুটবল ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম অধিনায়কের নাম কি – কেউ জবাব দেবে কাফু, কেউ বলবে স্টিভেন জেরার্ডের নাম, কারোর মনে হবে ফ্র্যানসেস্কো টট্টি বা অ্যালেসসান্দ্রো দেল পিয়েরো কিংবা পাওলো মালদিনির কথা, কারোর মনে ভাসবে ডিয়েগো ম্যারাডোনা বা কার্লোস আলবার্তোর ছবি। ক’জনের মাথায় আসবে ওবদুলিও ভ্যারেলার কথা? বা আদৌ আসবে কি?
১৯৫০ বিশ্বকাপের সেই ফাইনালের হাফটাইমে উরুগুয়ে তখন ১-০ গোলে পিছিয়ে। কোচ হুয়ান লোপেজ ড্রেসিংরুমে দলকে আদেশ দিয়ে গেলেন রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলার জন্য। রুম থেকে কোচ বের হয়ে যাবার পর অধিনায়ক অবদুলিও ভ্যারেলা সবার মধ্যমণি হয়ে বলা শুরু করলেন, “হুয়ানসিতো (হুয়ান লোপেজ) একজন অনেক ভালো মানুষ, কিন্তু বলতে বাধ্য হচ্ছি, তিনি আজকে ভুল বলেছেন। আমরা যদি অতি-আক্রমণাত্মক ব্রাজিলের বিরুদ্ধে অতি-রক্ষণাত্মক খেলি, তাহলে আমাদেরকেও সুইডেন বা স্পেইনের ভাগ্যই বরণ করতে হবে…” আগের ম্যাচগুলোতে সুইডেন আর স্পেইনকে ব্রাজিল ৬-৭ টা করে গোল দিয়েছিল। ওবদুলিও ভ্যারেলা দলকে আবেগাক্রান্ত একটা ভাষণে বোঝালেন, মাঠের খেলা দেখতে আসা দুই লক্ষ দর্শক কিন্তু মাঠে খেলবে না, খেলতে হবে এগারো জনকেই, তাই দর্শক দেখে ভড়কে না গিয়ে নিজেদের স্বাভাবিক আক্রমণাত্মক খেলা খেলেই ভড়কে দিতে হবে ব্রাজিলকে। একটা কথা বলে রাখা ভালো, ফাইনালের দিন ব্রাজিলিয়ান দৈনিক “ও মুন্দো” ব্রাজিল দলের একটা ছবি ছাপিয়ে হেডলাইন দিয়েছিল, “এরাই হল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন!” – এই পত্রিকার যত সম্ভব সংখ্যা তাঁর পক্ষে কেনা সম্ভব ততগুলো সংখ্যা কিনে ভ্যারেলা নিজেদের ড্রেসিংরুমের ওয়াশরুমের মেঝেতে ফেলে রেখেছিলেন, সতীর্থদের উৎসাহ দিয়েছিলেন পত্রিকার কপিগুলোর উপর প্রস্রাব করতে!
ভ্যারেলার ঐ আবেগঘন বক্তব্যেই উরুগুয়ে নিজেদের শক্তি সম্বন্ধে নতুন করে ধারণা পায়, দ্বিতীয়ার্ধে পুনরুজ্জীবিত এক উরুগুয়ে হুয়ান আলবার্তো শিফিয়ানো আর আলসিদেস ঘিগিয়ার গোলে ২-১ গোলে জিতে মারাকানাকে স্তব্ধ করে দিয়ে জিতে নেয় বিশ্বকাপ। সেদিন ব্রাজিলের বিখ্যাত আক্রমণ দ্বিতীয়ার্ধে আরেকটাও গোল করতে পারেনি। তিনজনের ডিফেন্সের সামনে সেদিন চীনের মহাপ্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন দলের ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার অধিনায়ক – ওবদুলিও ভ্যারেলা। দলের গোল দুটিও তাঁর বানিয়ে দেওয়া বল দিয়েই হয়েছিল!

*মে ১, ২০১৮ তারিখে গোল্লাছুট ডটকমে প্রকাশিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Post

Got a PROJECT

IN MIND?

©2024 Nishat Ahmed Zishan, All Rights Reserved.

Developed by Asif Mollik