স্পেন-ইংল্যান্ড : ট্যাকটিকাল প্রিভিউ

তিন বছর পর আবারও ইউরো’র ফাইনালে ইংল্যান্ড। ওদিকে ২০১২ সালে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ইউরো জেতা স্পেন পরের এক যুগ ফাইনালের মুখই দেখেনি। আগের ইউরোর ইংল্যান্ড আর এই ইংল্যান্ডের মধ্যে তেমন পার্থক্য না থাকলেও, চমকে দিচ্ছে স্পেনের বদলে যাওয়া।
স্পেন কী তবে তিকিতাকায় আসক্ত নয় আর? সেটা স্পষ্টভাবে বলা যাবে না। বললে রদ্রি-পেদ্রি-ফাবিয়ান রুইসরা রাগও করতে পারেন। তবে এই স্পেনকে শাভি-ইনিয়েস্তার স্পেন থেকে আলাদা করছে বেশ কিছু কারণ।
মাঝমাঠের জাদুকর দিয়ে ঠাসা ওই স্পেন দলের মাঝমাঠে তো মিডফিল্ডাররা খেলতেনই, ফরোয়ার্ড লাইনেও খেলানো হতো সেস ফাব্রিগাস, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা বা দাভিদ সিলভার মতো মিডফিল্ডারদের। কখনও-সখনও দেখা যেত সান্তি কাসোরলা, হুয়ান মাতাদেরও। একাদশে ছয়-সাতজন পোক্ত মিডফিল্ডার দিয়েও যে ইউরো জেতা যায়, এক যুগ আগে দেখিয়েছিল স্পেনই। গতি বা ড্রিবলের ঝলকে সাইডলাইন মাতানো উইঙ্গার বা ডি-বক্সে ওঁত পেতে থাকা গোলশিকারী স্ট্রাইকারদের দাম ছিল না তেমন। যে কারণে বেঞ্চে বসে থাকতে হয়েছে ফের্নান্দো তোরেস, আলভারো নেগ্রেদো, ফের্নান্দো ইয়োরেন্তে বা হেসুস নাভাসের মতো ফরোয়ার্ডদের।
এই স্পেন অবশ্য অমন নয়। নিজেদের ঐতিহ্যবাহী তিকিতাকার আমেজটা বজায় রাখলেও উইং-প্লে বা ‘নাম্বার নাইন’-দের গুরুত্ব ভোলেননি লুই দে লা ফুয়েন্তে। দলের অধিনায়ক আলভারো মোরাতাই আদর্শ ‘নাম্বার নাইন’। দুই উইংয়ে নিকো উইলিয়ামস আর লামিন ইয়ামাল মনে করিয়ে দিচ্ছেন ফ্রাঙ্ক রিবেরি-আরিয়ান রবেন দের দুর্ধর্ষ গতি আর চাতুর্যকে।
তাই বলে ‘ফলস নাইন’ও কি নেই? আছে আছে। ২০১২ ইউরোতে সেস ফাব্রিগাস যা করেছিলেন, প্রয়োজনে সেটাও করে দেখানোর জন্য স্কোয়াডে আছেন দানি অলমো। এই স্পেন দুধারি তলোয়ার। শুধু এক তিকিতাকার ভেলায় চড়ে ইউরো জিততে আসেনি। এই স্পেন উইংয়ের খেলায় বাজিমাত করতে পারে, বল হারালে নিরন্তর প্রেস করে বলের দখল কেড়ে নিতে পারে নিমেষেই।
ইংল্যান্ডের সামনে তাই মস্ত পাহাড়। যেটাকে ডিঙাতে পারলেই কেবল ৫৮ বছর পর বৈশ্বিক শিরোপার দেখা পাবে ফুটবলের জন্মদাতারা। স্পেন যেভাবে খেলছে, উইলিয়ামস-ইয়ামালদের থামাতে নিজেদের শক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করার চাইতে বরং স্পেনের দুর্বলতা খুঁজে বের করে সেটার সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করাই ভালো হবে ইংলিশদের জন্য।
সুপারম্যান হওয়ার চেষ্টা করে লাভ নেই, বরং কীভাবে ক্রিপ্টোনাইট হয়ে সুপারম্যানকে বশে আনা যায়, সে কৌশলই আয়ত্ত্ব করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
অবশ্য গ্যারেথ সাউথগেট আজীবনই সেটা করে এসেছেন। কখনও প্রোঅ্যাকটিভ নন, বরং রিঅ্যাকটিভ ম্যানেজারই ছিলেন। প্রতিপক্ষের দুর্বলতার ওপর নির্ভর করে কৌশল সাজাতেই স্বচ্ছন্দ তিনি। সে হিসেবে স্পেনের দুর্বলতার উপর নির্ভর করে কৌশল সাজানোই দুরস্ত – তা নয় কি?
সেটা করতে গেলে অবশ্য সবার আগে বেঞ্চে বসার কথা ফিল ফোডেনের। ইয়ামাল আর উইলিয়ামস দুই উইংয়ে যতই ত্রাস ছড়ান, মাঝমাঠ থেকে পাসের ফুলঝুরি ছুটিয়ে খেলার গতিপথ নির্ধারণ করে দেন ম্যানচেস্টার সিটিতে ফোডেন-সতীর্থ রদ্রিই। রদ্রি থামলে থামবেন ইয়ামাল-উইলিয়ামস, থামবে স্পেন – এমনটা বললেও খুব বেশি ভুল বলা হবে না। এখন এই রদ্রিকে থামাতে হলে এমন একজনকে দরকার, যে সবকিছু ভুলে পুরো ম্যাচ রদ্রির পায়ে যেন বল না আসে, এলেও যেন রদ্রি শান্তিমতো নিখুঁতভাবে আক্রমণ গঠন করতে না পারেন – সেটা নিশ্চিত করতে পারে।
ইংল্যান্ডে এমন খেলোয়াড় একজনই আছেন – চেলসির কনর গ্যালাঘার। গত মৌসুমে চেলসি-ম্যানচেস্টার সিটির প্রত্যেকটা লড়াইয়ে রদ্রিকে এক মুহূর্তের জন্য স্বস্তিতে থাকতে দেননি এই মিডফিল্ডার। সমস্যা একটাই, গ্যালাঘার এই ইংল্যান্ডের মূল একাদশের অংশ নন। ডেকলান রাইসের সঙ্গী হিসেবে গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচ খেললেও পরে ওই ভূমিকায় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কোই মাইনুকেই মনে ধরেছে সাউথগেটের। ফাইনালেও রাইস-মাইনুর ওপরেই ভরসা রাখবেন, বলাই যায়। সেক্ষেত্রে তৃতীয় মিডফিল্ডার হিসেবে খেলা উচিত কনর গ্যালাঘারের।
রদ্রিকে থামাতে পারলে স্পেনের পজেশন-নির্ভর খেলায় ব্যাঘাত আসবে, বলের দখল পাবে ইংল্যান্ড। আর স্পেনের কার্যকরী প্রেস এড়িয়ে যেই যৎসামান্য সময়ে ইংল্যান্ডের পায়ে বল থাকবে, ঐ সময়টাই কাজে লাগাতে হবে দ্রুত প্রতি আক্রমণে উঠে গোল করার ব্যাপারে। এ কাজে কনর গ্যালাঘার, জুড বেলিংহ্যাম, ডেকলান রাইস বা বুকায়ো সাকা-রা ইংল্যান্ডকে যতটুকু সাহায্য করতে পারবেন – ফোডেন বা হ্যারি কেইন ততটা পারবেন না। কেইন এ দলের অধিনায়ক, তাঁকে বেঞ্চে বসানোর সাহস সাউথগেট কোনোভাবেই দেখাবেন না। বাকি থাকেন ফোডেন। এখন ফোডেনকে বেঞ্চে বসানোর সাহস সাউথগেটের আছে কি না, সেটাই দেখার বিষয়।
ইংল্যান্ডের জন্য সুসংবাদ, ফিট হয়েছেন লুক শ। গোটা ইংল্যান্ডে এই একজন খেলোয়াড়ই আছেন, যিনি ইংল্যান্ডের ডান দিক ও বাঁদিকে একটা ভারসাম্য রাখতে পারেন। না হলে প্রত্যেক খেলোয়াড়ই হয় ডান দিকে খেলতে পছন্দ করেন, বা বাঁদিকে খেললেও মাঝখানে চলে আসেন ফোডেনের মতো – তখন বাঁদিকের সাইডলাইন এলাকা দখল করে রাখার মতো খেলোয়াড় থাকে না (শ ফিট না থাকার কারণে যে একজন খেলোয়াড় এই কাজটা করতেন, সেই অ্যান্থনি গর্ডনের ওপর আস্থা নেই সাউথগেটের)।
শ এর জায়গায় এতদিন লেফটব্যাক হিসেবে যিনি খেলেছেন, সে কিয়েরান ট্রিপিয়েরও মূলতঃ রাইটব্যাকই। শ ফিরে আসার কারণে পুরোপুরি ‘ডানপন্থী’ হয়ে যাওয়ার এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাচ্ছে ইংল্যান্ড। শুধু তাই নয়, আক্রমণের ডানদিক থেকে লামিন ইয়ামাল যেভাবে নিখুঁত ক্রস ফেলেন বক্সে, সেটা আটকানোর জন্যও ট্রিপিয়েরের মতো ‘মেইকশিফট’ লেফটব্যাকের চেয়ে শ-এর মতো প্রথাগত লেফটব্যাক বেশি কাজে আসবেন।
ইংল্যান্ড যেখানে ‘ডানপন্থী’, স্পেন বেশ ভালোভাবেই ‘বামপন্থী’। অবশ্য ইংল্যান্ড যেখানে চোটসমস্যার কারণে বাধ্য হয়ে ‘ডানপন্থী’, স্পেন সেখানে সজ্ঞানে, স্বেচ্ছাতেই ‘বামপন্থী’। বাঁ দিকের উইঙ্গার নিকো উইলিয়ামস আর লেফটব্যাক মার্ক কুকুরেয়া যেভাবে লেফট উইং আর লেফট হাফ স্পেইসে নিজেদের মধ্যে জায়গা পরিবর্তন করে করে খেলেন, স্পেনের আক্রমণের অন্যতম মূল কৌশল সেটা। শুধু তাই নয়, বলের দখল নিজেদের কাছে থাকলে বাঁদিকের সেন্টারব্যাক, বাঁ পায়ের খেলোয়াড় এমেরিক লাপোর্তও বাঁদিকের মিডফিল্ড পজিশনে চলে যান, সেখানের মিডফিল্ডার ফাবিয়ান রুইস রদ্রির পাশ থেকে ওপরে উঠে যান নিকো উইলিয়ামসকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য। বাঁদিকে উইলিয়ামস-কুকুরেয়া-লাপোর্তদের সঙ্গী হওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনে ডি-বক্সে সরাসরি ঢুকে যাওয়ার এ প্রবণতাই পিএসজির এই মিডফিল্ডারকে এনে দিয়েছে দুটি করে গোল-অ্যাসিস্ট। ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালটাই দেখুন, মাঠের অপর প্রান্তে এমবাপ্পে আছেন, তাতে কি? স্পেন বাঁদিক থেকেই নিজেদের অধিকাংশ আক্রমণ রচনা করেছে, একাধিক খেলোয়াড়কে স্থাপন করেছে মাঠের বাঁদিকে।
রদ্রিকে থামানোর পাশাপাশি ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় কাজ হবে স্পেনের বাঁদিকের এই আধিপত্যকে খর্ব করা। ইংল্যান্ডের রাইটব্যাক হিসেবে নিঃসন্দেহে খেলবেন কাইল ওয়াকার, নিকো উইলিয়ামসকে গতির খেলায় হারানোর দায়িত্ব থাকবে যার ওপর। শুধু ওয়াকারই নন, ওই দিকটা নির্বিষ করার জন্য রাইট উইঙ্গার বুকায়ো সাকা বা ওদিকের মিডফিল্ডার কোবি মাইনুকেও এগিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজনে নিচে নেমে রক্ষণও যে করতে পারেন, সেটা অবশ্য সাকা সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষেই দেখিয়েছেন – ব্যাপারটা স্বস্তি দেবে সাউথগেটকে।


স্পেনের এই ‘বামপন্থী’ হওয়ার পেছনে আরেকটা বড় কারণও আছে। ডানদিকে থাকা রাইটব্যাক দানি কারভাহাল (বা কারভাহালের নিষেধাজ্ঞার কারণে সেমিতে খেলা হেসুস নাভাস), ডানদিকে সেন্টারব্যাক নাচো ফের্নান্দেস বা রবিন লে নরমান্ড – কেউই প্রতি আক্রমণ ঠেকানোর ব্যাপারে ক্ষেত্রে অতটা দক্ষ নন। মাঝমাঠের ডানদিকে থাকা পেদ্রি মূলত ফ্রি-রোলে খেলেন, তাই তাঁকে দিয়েও রক্ষণের কাজ অতটা হয় না। এই জায়গায় দ্রুত প্রতি আক্রমণে উঠলে গোল করার সুযোগ সৃষ্টি হয় নিশ্চিত, জর্জিয়ার মতো পুঁচকে দলও কভিচা কাভারাৎসখেইয়াকে দিয়ে যা করে দেখিয়েছে। জর্জিয়া করতে পারলে, ইংল্যান্ড পারবে না?


পারা উচিত। আর সেটা করার জন্য হলেও ইংল্যান্ডের লেফট উইংয়ে এমন একজনকে থাকতে হবে যে কিনা দ্রুত প্রতি আক্রমণে উঠে ডি-বক্সে ঢুকে যেতে পারবে। সেটা আর যাই হোক, ফোডেন নন। আর ইংল্যান্ডের আক্রমণভাগে যদি এমন খেলোয়াড়ের আধিক্য থাকে যারা হুটহাট করে বক্সে ঢুকে গিয়ে প্রেস করতে পারে, সেটা স্পেনের গোলকিপার উনাই সিমোনকেও যন্ত্রণায় ফেলবে। কারণ অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের এই গোলকিপার প্রেসের মুখে একদমই স্বচ্ছন্দ নন, প্রেসের মুখে পড়লে বাধ্য হলে লং বল খেলেন, আর সেই লং বল প্রায় সময়েই অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছায় না।
সাউথগেট কি শুনছেন?
স্পেনকে হারানোর জন্য ইংল্যান্ডের একাদশ যা হওয়া উচিত –
(৩-৪-২-১)
পিকফোর্ড
ওয়াকার-স্টোনস-কনসা
সাকা-মাইনু-রাইস-শ
গ্যালাঘার-বেলিংহ্যাম
কেইন
ইংল্যান্ডকে হারানোর জন্য স্পেনের একাদশ যেমন হওয়া উচিত –
(৪-৩-৩)
সিমোন
কারভাহাল-নাচো-লাপোর্ত-কুকুরেয়া
পেদ্রি-রদ্রি-রুইস
ইয়ামাল-মোরাতা-উইলিয়ামস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Post

Got a PROJECT

IN MIND?

©2024 Nishat Ahmed Zishan, All Rights Reserved.

Developed by Asif Mollik